ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত ও মজলুম মানবতার পাশে দাঁড়ানোর নামে 'সাদাকাহ প্যালেস্টাইন' (Sadaqah Palestine) নামের একটি ভুয়া চ্যারিটি সংস্থা খুলে বিশ্বজুড়ে প্রতারণার জাল বিছিয়েছিল একটি ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান। ফ্রান্সের প্রভাবশালী দৈনিক লিবারেশন এবং ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ-এর এক যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ভয়ঙ্কর জালিয়াতির তথ্য ফাঁস হয়েছে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, ফিলিস্তিনপ্রেমী মুসলিম ও শান্তিকামী মানুষের আবেগ ও সহানুভূতিকে পুঁজি করে অর্থ আত্মসাৎ এবং সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়াই ছিল এই ইসরায়েলি চক্রের মূল উদ্দেশ্য।
ফিলিস্তিনের গাজা ও অন্যান্য অঞ্চলে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলায় বাস্তুচ্যুত ও দুর্গত মানুষের প্রতি বিশ্ববাসীর সহানুভূতিকে এবার নোংরা সম্পদে রূপান্তরের অপচেষ্টা চালিয়েছে খোদ ইসরায়েলি একটি সাইবার অপরাধী চক্র। ফ্রান্সের প্রভাবশালী সংবাদপত্র লিবারেশন এবং ইসরায়েলের নিজস্ব দৈনিক হারেৎজ-এর একটি যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সে কট্টর মুসলিম-বিদ্বেষী ও উগ্র ডানপন্থীদের মদদদাতা এবং স্থানীয় নির্বাচনে অবৈধ হস্তক্ষেপের দায়ে অভিযুক্ত একটি ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান ছদ্মনামে এই ভুয়া ফিলিস্তিনি সাহায্য সংস্থাটি পরিচালনা করছিল।
'সাদাকাহ প্যালেস্টাইন' এবং প্রতারণার নেটওয়ার্ক
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চক্রটি ‘সাদাকাহ প্যালেস্টাইন’ নামে একটি আকর্ষণীয় ওয়েবসাইট তৈরি করে নিজেদের একটি আন্তর্জাতিক মানবিক এনজিও হিসেবে জাহির করত। সেখানে যুদ্ধ ও উচ্ছেদের শিকার ফিলিস্তিনিদের খাদ্য ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে অনলাইন পেমেন্ট বা ডোনেশনের আহ্বান জানানো হতো। ব্যাপক বিতর্কের মুখে ওয়েবসাইটটি বর্তমানে অফলাইনে নিয়ে যাওয়া হলেও এর আর্কাইভ রেকর্ড থেকে দেখা যায়, সেখানে টাকা জমা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল।
যুক্তরাজ্যে এই চ্যারিটির সদর দফতর দাবি করা হলেও ব্রিটিশ চ্যারিটি কমিশনের তালিকায় এই নামের কোনো বৈধ সংস্থার অস্তিত্ব খুঁজে পাননি তদন্তকারীরা। গণমাধ্যম দুটি জানিয়েছে, এটি কেবল অর্থ হাতানোর কোনো সাধারণ ফাঁদ ছিল, নাকি ফিলিস্তিনপন্থীদের ডাটাবেজ বা ব্যক্তিগত তথ্য চুরির কোনো গভীর ইহুদিবাদী ষড়যন্ত্র ছিল— তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে দুটি উদ্দেশ্যই একসাথে কাজ করার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
ডিজিটাল কারসাজি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
তদন্তে আরও প্রকাশ পায় যে, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম এবং ফেসবুকের মতো বড় বড় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভুয়া উদ্যোগের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। তবে এসব অ্যাকাউন্টের গতিবিধি পর্যালোচনা করে সাইবার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এগুলো ছিল সম্পূর্ণ কৃত্রিম ও ভুয়া। হাজার হাজার ফেক ফলোয়ার এবং সুসংগঠিত রোবোটিক বা 'বট' নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ফিলিস্তিনপন্থী প্রচারণার ভড়ং তৈরি করা হয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষ একে আসল মনে করে বিভ্রান্ত হয়।
নেপথ্যে কুখ্যাত 'ব্ল্যাককোর'
সবচেয়ে বিপজ্জনক তথ্য হলো, এই ভুয়া চ্যারিটি ওয়েবসাইটের ডিজিটাল অবকাঠামো, সার্ভার এবং ডোমেইন পরীক্ষা করে কারিগরি বিশেষজ্ঞরা এর সরাসরি লিংক খুঁজে পেয়েছেন ইসরায়েলি সাইবার ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ 'ব্ল্যাককোর' (BlackCore)-এর সাথে। এই ব্ল্যাককোর মূলত অনলাইনে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্য কুখ্যাত।
ইতিমধ্যেই ফরাসি প্রশাসন এই ব্ল্যাককোর-এর বিরুদ্ধে ফ্রান্সের পৌরসভা নির্বাচনে অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং ফিলিস্তিনের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ও মুসলিমদের প্রতি সহানুভূতিশীল ফরাসি রাজনৈতিক দল ‘ফ্রান্স আনবোড’-এর প্রার্থীদের টার্গেট করে নোংরা সাইবার হামলা চালানোর অভিযোগে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে। প্রতিবেদন অনুসারে, এই পর্দার আড়ালে থাকা মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচনে ফরাসি গোয়েন্দারা কাজ করছেন।
ডিজিটাল যুগে ভূরাজনৈতিক স্বার্থে কীভাবে মানবিক সংকটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাইবার অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, এই ঘটনা তার একটি বড় প্রমাণ। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো অনুযায়ী, বৈধ নিবন্ধন ছাড়া অনুদান সংগ্রহ এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে সাইবার হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বেআইনি। ফরাসি কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ব্ল্যাককোরের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলেও, এই সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্কটির পেছনে মূল হোতা বা কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে কিনা, তা স্বাধীনভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই জালিয়াতি আন্তর্জাতিক নাগরিক অধিকার ও সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইসরায়েলি বিভিন্ন বেসরকারি ইন্টেলিজেন্স ও সাইবার ফার্মের (যেমন পেগাসাস বা টিম হোর্হে) মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচন প্রভাবিত করা এবং ডার্ক ওয়েবে ভুয়া প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর একাধিক ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুন ২০২৬
ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত ও মজলুম মানবতার পাশে দাঁড়ানোর নামে 'সাদাকাহ প্যালেস্টাইন' (Sadaqah Palestine) নামের একটি ভুয়া চ্যারিটি সংস্থা খুলে বিশ্বজুড়ে প্রতারণার জাল বিছিয়েছিল একটি ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান। ফ্রান্সের প্রভাবশালী দৈনিক লিবারেশন এবং ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ-এর এক যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ভয়ঙ্কর জালিয়াতির তথ্য ফাঁস হয়েছে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, ফিলিস্তিনপ্রেমী মুসলিম ও শান্তিকামী মানুষের আবেগ ও সহানুভূতিকে পুঁজি করে অর্থ আত্মসাৎ এবং সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়াই ছিল এই ইসরায়েলি চক্রের মূল উদ্দেশ্য।
ফিলিস্তিনের গাজা ও অন্যান্য অঞ্চলে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলায় বাস্তুচ্যুত ও দুর্গত মানুষের প্রতি বিশ্ববাসীর সহানুভূতিকে এবার নোংরা সম্পদে রূপান্তরের অপচেষ্টা চালিয়েছে খোদ ইসরায়েলি একটি সাইবার অপরাধী চক্র। ফ্রান্সের প্রভাবশালী সংবাদপত্র লিবারেশন এবং ইসরায়েলের নিজস্ব দৈনিক হারেৎজ-এর একটি যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সে কট্টর মুসলিম-বিদ্বেষী ও উগ্র ডানপন্থীদের মদদদাতা এবং স্থানীয় নির্বাচনে অবৈধ হস্তক্ষেপের দায়ে অভিযুক্ত একটি ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান ছদ্মনামে এই ভুয়া ফিলিস্তিনি সাহায্য সংস্থাটি পরিচালনা করছিল।
'সাদাকাহ প্যালেস্টাইন' এবং প্রতারণার নেটওয়ার্ক
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চক্রটি ‘সাদাকাহ প্যালেস্টাইন’ নামে একটি আকর্ষণীয় ওয়েবসাইট তৈরি করে নিজেদের একটি আন্তর্জাতিক মানবিক এনজিও হিসেবে জাহির করত। সেখানে যুদ্ধ ও উচ্ছেদের শিকার ফিলিস্তিনিদের খাদ্য ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে অনলাইন পেমেন্ট বা ডোনেশনের আহ্বান জানানো হতো। ব্যাপক বিতর্কের মুখে ওয়েবসাইটটি বর্তমানে অফলাইনে নিয়ে যাওয়া হলেও এর আর্কাইভ রেকর্ড থেকে দেখা যায়, সেখানে টাকা জমা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল।
যুক্তরাজ্যে এই চ্যারিটির সদর দফতর দাবি করা হলেও ব্রিটিশ চ্যারিটি কমিশনের তালিকায় এই নামের কোনো বৈধ সংস্থার অস্তিত্ব খুঁজে পাননি তদন্তকারীরা। গণমাধ্যম দুটি জানিয়েছে, এটি কেবল অর্থ হাতানোর কোনো সাধারণ ফাঁদ ছিল, নাকি ফিলিস্তিনপন্থীদের ডাটাবেজ বা ব্যক্তিগত তথ্য চুরির কোনো গভীর ইহুদিবাদী ষড়যন্ত্র ছিল— তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে দুটি উদ্দেশ্যই একসাথে কাজ করার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
ডিজিটাল কারসাজি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
তদন্তে আরও প্রকাশ পায় যে, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম এবং ফেসবুকের মতো বড় বড় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভুয়া উদ্যোগের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। তবে এসব অ্যাকাউন্টের গতিবিধি পর্যালোচনা করে সাইবার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এগুলো ছিল সম্পূর্ণ কৃত্রিম ও ভুয়া। হাজার হাজার ফেক ফলোয়ার এবং সুসংগঠিত রোবোটিক বা 'বট' নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ফিলিস্তিনপন্থী প্রচারণার ভড়ং তৈরি করা হয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষ একে আসল মনে করে বিভ্রান্ত হয়।
নেপথ্যে কুখ্যাত 'ব্ল্যাককোর'
সবচেয়ে বিপজ্জনক তথ্য হলো, এই ভুয়া চ্যারিটি ওয়েবসাইটের ডিজিটাল অবকাঠামো, সার্ভার এবং ডোমেইন পরীক্ষা করে কারিগরি বিশেষজ্ঞরা এর সরাসরি লিংক খুঁজে পেয়েছেন ইসরায়েলি সাইবার ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ 'ব্ল্যাককোর' (BlackCore)-এর সাথে। এই ব্ল্যাককোর মূলত অনলাইনে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্য কুখ্যাত।
ইতিমধ্যেই ফরাসি প্রশাসন এই ব্ল্যাককোর-এর বিরুদ্ধে ফ্রান্সের পৌরসভা নির্বাচনে অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং ফিলিস্তিনের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ও মুসলিমদের প্রতি সহানুভূতিশীল ফরাসি রাজনৈতিক দল ‘ফ্রান্স আনবোড’-এর প্রার্থীদের টার্গেট করে নোংরা সাইবার হামলা চালানোর অভিযোগে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে। প্রতিবেদন অনুসারে, এই পর্দার আড়ালে থাকা মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচনে ফরাসি গোয়েন্দারা কাজ করছেন।
ডিজিটাল যুগে ভূরাজনৈতিক স্বার্থে কীভাবে মানবিক সংকটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাইবার অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, এই ঘটনা তার একটি বড় প্রমাণ। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো অনুযায়ী, বৈধ নিবন্ধন ছাড়া অনুদান সংগ্রহ এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে সাইবার হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বেআইনি। ফরাসি কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ব্ল্যাককোরের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলেও, এই সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্কটির পেছনে মূল হোতা বা কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে কিনা, তা স্বাধীনভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই জালিয়াতি আন্তর্জাতিক নাগরিক অধিকার ও সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইসরায়েলি বিভিন্ন বেসরকারি ইন্টেলিজেন্স ও সাইবার ফার্মের (যেমন পেগাসাস বা টিম হোর্হে) মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচন প্রভাবিত করা এবং ডার্ক ওয়েবে ভুয়া প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর একাধিক ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন