শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
কওমী টাইমস

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট প্রধান ফাতেমা মেরিচ ইলমাজের জরুরি সংহতির আহ্বান। ৯ বছর পার হলেও কমেনি সংকট, কমছে কেবল আন্তর্জাতিক সাহায্য

আন্তর্জাতিক তহবিল সংকট: রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের



আন্তর্জাতিক তহবিল সংকট: রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের

মিয়ানমারে ভয়াবহ জাতিগত নিধন ও গণহত্যার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমদের আন্তর্জাতিক তহবিল দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং মানবিক সংকট তীব্র রূপ নিচ্ছে। শুক্রবার (২৬ জুন, ২০২৬) কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের (তুর্ক কিজিলে) সভাপতি ফাতেমা মেরিচ ইলমাজ। তিনি এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্ববাসীকে মুসলিম উম্মাহ ও মজলুম মানবতার পাশে দাঁড়ানোর জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

মিয়ানমারের উগ্র বৌদ্ধ ও সামরিক জান্তার বর্বরতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য ও তহবিল আশঙ্কাজনক হারে কমছে। তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের (Türk Kızılay) সভাপতি ফাতেমা মেরিচ ইলমাজ সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বা তহবিল কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কষ্ট ও মানবিক সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।

শুক্রবার কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের সময় তিনি এই মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসেবে তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থান করছে। সফরকালে তুর্কি প্রতিনিধি দলটি রোহিঙ্গা মুসলিমদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের জরুরি মানবিক সহায়তার বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সভাপতি ফাতেমা মেরিচ ইলমাজ কক্সবাজারে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (IFRC) এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন। উক্ত বৈঠকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বর্তমান মানবিক চাহিদা, ভবিষ্যৎ যৌথ কর্মপরিকল্পনা এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হয়।

বৈঠক শেষে ফাতেমা মেরিচ ইলমাজ বলেন, "আরাকান (রাখাইন) সংকটের বয়স প্রায় ৯ বছর হতে চলল। এত দীর্ঘ সময় পার হলেও রোহিঙ্গা মুসলিমদের মানবিক চাহিদা মোটেও কমেনি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তহবিল ও মনোযোগ দুটোই কমে যাচ্ছে। এই অর্থসংকট সরাসরি শরণার্থীদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সুরক্ষার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।"

সফরকালে তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট প্রধান ১৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং সেখানে তুর্কি সংস্থার চলমান ত্রাণ কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। তিনি অসহায় রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন এবং ক্যাম্পে স্থাপিত তুর্কি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের  কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন। এ ছাড়া তিনি তুর্কি সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থা (TIKA) পরিচালিত বহুমুখী কেন্দ্র, তুর্কি দিয়ানেত ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং সেখানে কর্মরত তুর্কি ফিল্ড হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

দীর্ঘ বছর ধরে লাখ লাখ মজলুম রোহিঙ্গা মুসলিমকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ইলমাজ। তিনি এটিকে একটি অনন্য ও বিশাল মানবিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট কেবল শরণার্থীদের মৌলিক চাহিদাই পূরণ করছে না, বরং শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসন ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্র উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো রাখাইন রাজ্যে মুসলিমদের ওপর ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও বর্বর গণহত্যা চালায়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে "জাতিগত নিধন" ও "গণহত্যা" হিসেবে অভিহিত করেছে। সেই সময় জীবন বাঁচাতে প্রায় ৯ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বছরের পর বছর পার হলেও মিয়ানমার সরকার তাদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি চলমান ক্ষত।

বিষয় : বাংলাদেশ তুরস্ক রোহিঙ্গা তুর্ক কিজিলে

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬


আন্তর্জাতিক তহবিল সংকট: রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image

মিয়ানমারে ভয়াবহ জাতিগত নিধন ও গণহত্যার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমদের আন্তর্জাতিক তহবিল দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং মানবিক সংকট তীব্র রূপ নিচ্ছে। শুক্রবার (২৬ জুন, ২০২৬) কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের (তুর্ক কিজিলে) সভাপতি ফাতেমা মেরিচ ইলমাজ। তিনি এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্ববাসীকে মুসলিম উম্মাহ ও মজলুম মানবতার পাশে দাঁড়ানোর জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

মিয়ানমারের উগ্র বৌদ্ধ ও সামরিক জান্তার বর্বরতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য ও তহবিল আশঙ্কাজনক হারে কমছে। তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের (Türk Kızılay) সভাপতি ফাতেমা মেরিচ ইলমাজ সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বা তহবিল কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কষ্ট ও মানবিক সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।

শুক্রবার কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের সময় তিনি এই মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসেবে তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থান করছে। সফরকালে তুর্কি প্রতিনিধি দলটি রোহিঙ্গা মুসলিমদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের জরুরি মানবিক সহায়তার বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সভাপতি ফাতেমা মেরিচ ইলমাজ কক্সবাজারে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (IFRC) এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন। উক্ত বৈঠকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বর্তমান মানবিক চাহিদা, ভবিষ্যৎ যৌথ কর্মপরিকল্পনা এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হয়।

বৈঠক শেষে ফাতেমা মেরিচ ইলমাজ বলেন, "আরাকান (রাখাইন) সংকটের বয়স প্রায় ৯ বছর হতে চলল। এত দীর্ঘ সময় পার হলেও রোহিঙ্গা মুসলিমদের মানবিক চাহিদা মোটেও কমেনি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তহবিল ও মনোযোগ দুটোই কমে যাচ্ছে। এই অর্থসংকট সরাসরি শরণার্থীদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সুরক্ষার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।"

সফরকালে তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট প্রধান ১৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং সেখানে তুর্কি সংস্থার চলমান ত্রাণ কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। তিনি অসহায় রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন এবং ক্যাম্পে স্থাপিত তুর্কি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের  কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন। এ ছাড়া তিনি তুর্কি সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থা (TIKA) পরিচালিত বহুমুখী কেন্দ্র, তুর্কি দিয়ানেত ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং সেখানে কর্মরত তুর্কি ফিল্ড হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

দীর্ঘ বছর ধরে লাখ লাখ মজলুম রোহিঙ্গা মুসলিমকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ইলমাজ। তিনি এটিকে একটি অনন্য ও বিশাল মানবিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট কেবল শরণার্থীদের মৌলিক চাহিদাই পূরণ করছে না, বরং শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসন ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্র উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো রাখাইন রাজ্যে মুসলিমদের ওপর ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও বর্বর গণহত্যা চালায়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে "জাতিগত নিধন" ও "গণহত্যা" হিসেবে অভিহিত করেছে। সেই সময় জীবন বাঁচাতে প্রায় ৯ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বছরের পর বছর পার হলেও মিয়ানমার সরকার তাদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি চলমান ক্ষত।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ