২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেনের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জনকে চরম উল্লাসের সাথে উদযাপন করেছে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিরা। ইসরাইলি বর্বর আগ্রাসন, স্থায়ী বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং তীব্র ইন্টারনেট সংকটের কারণে ঘরে বসে খেলা দেখার সুযোগ না থাকায় হাজার হাজার গাজাবাসী ক্যাফে, রাস্তা এবং উন্মুক্ত স্কয়ারে প্রজেক্টরের সামনে জড়ো হন। স্পেনের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান এবং স্প্যানিশ তারকা লামিন ইয়ামালের ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির কারণে এই ফাইনালে গাজাবাসী স্পেনের পক্ষে বুক বেঁধেছিলেন, যা রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর পর এক অভূতপূর্ব বিজয়ানন্দে রূপ নেয়।
দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর লাগাতার বোমাবর্ষণ, ধ্বংসযজ্ঞ এবং অবর্ণনীয় মানবিক সংকটের মাঝেও গাজা উপত্যকায় আজ দেখা গেছে এক টুকরো খুশির ঝলক। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের রোমাঞ্চকর ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে পরাজিত করে স্পেনের শিরোপা জয় ফিলিস্তিনিদের মুখে এনে দিয়েছে এক চিলতে হাসি।
দীর্ঘদিন ধরে চলা অবরোধ আর আগ্রাসনে গাজার বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রায়। ফলে নিজেদের তাঁবু বা ঘরে বসে খেলা দেখার কোনো উপায় ছিল না সাধারণ মানুষের। এই ম্যাচটি দেখার জন্য গাজার হাজার হাজার মানুষ উপত্যকার বিভিন্ন ক্যাফে, খোলা রাস্তা এবং শরণার্থী শিবিরের ধ্বংসাবশেষের মাঝে স্থাপিত অস্থায়ী বড় পর্দার সামনে ভিড় জমান। ম্যাচ জুড়ে টানটান উত্তেজনার পর যখন স্পেন জয়সূচক গোলটি করে এবং ম্যাচ শেষ হয়, তখন পুরো গাজা মুখরিত হয়ে ওঠে করতালি আর উল্লাসধ্বনিতে।
ম্যাচ শেষে আনাদোলু এজেন্সির সাথে আলাপকালে নোমান আবদুল্লাহ নামের এক ফিলিস্তিনি নাগরিক বলেন, "স্পেন দীর্ঘ বছর ধরে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তারা আমাদের ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। এই কারণে আমরা আজ সবাই মিলে স্পেনকে সমর্থন করতে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে এখানে সমবেত হয়েছিলাম।" তিনি আরও যোগ করেন, ফিলিস্তিনিরা মূলত শান্তিপ্রিয় জাতি এবং এই উদযাপনের মাধ্যমে তারা বিশ্বকে বার্তা দিতে চান যে—তারা শান্তি, সংহতি এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো স্বাধীনতাকামী জাতিগুলোর সাথে সর্বদা ঐক্যবদ্ধ।
আরেক গাজাবাসী হানি আবু জার্ক বলেন, ইসরাইলি হামলা, ধ্বংসলীলা ও কঠিন জীবনযাত্রার মধ্যেও বিশ্বকাপের এই ফাইনাল গাজাবাসীকে ক্ষণিকের জন্য হলেও বেঁচে থাকার নতুন মানসিক শক্তি ও মনোবল জুগিয়েছে। তিনি বলেন, "বিশ্বের যে প্রান্তেই হোক না কেন, যারা ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলে, আমরা তাদের ভালোবাসি। বিশেষ করে স্প্যানিশ তারকা ফুটবলার লামিন ইয়ামাল যেভাবে ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার প্রকাশ্য সমর্থন ও সংহতি জানিয়েছেন, তা গাজার তরুণদের হৃদয় জয় করেছে। মূলত ইয়ামাল ও স্পেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই আমরা আজ তাদের জন্য গলা ফাটিয়েছি।"
তাঁবুতে মানবেতর জীবনযাপন করা মাহমুদ দিয়াব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ফিলিস্তিন ইস্যু কোনো আঞ্চলিক বিষয় নয়, বরং এটি পৃথিবীর সমস্ত মুক্তিকামী ও বিবেকবান মানুষের একটি অভিন্ন লড়াই। গাজাবাসীর এই দুঃখকষ্টের মাঝে ফুটবল যেভাবে সবাইকে এক করেছে, ঠিক সেভাবেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ববাসীকে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
ইসরাইলি কূটনীতির পরাজয়
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, এই ফাইনালে মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও ছিল এক রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার কড়া সমালোচনা করায় স্পেনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তেল আবিব। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার উগ্রপন্থী মন্ত্রীরা ফাইনালে আর্জেন্টিনার কট্টর সমর্থন করেছিলেন।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, ইসরাইলে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত শিমন অ্যাক্সেল ওয়াহনিশ নেতানিয়াহুকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলির একটি অডিও বার্তা শুনিয়েছিলেন, যেখানে মিলি নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন—"আপনি আমার প্রকৃত বন্ধু, আপনি সবসময় আমাদের সমর্থন করেন। আপনি আর্জেন্টিনার পক্ষে আছেন শুনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।" জবাবে নেতানিয়াহু বলেছিলেন—"হাভিয়ের, তুমি একজন সত্যিকারের বন্ধু। আমরা আর্জেন্টিনার পাশে আছি।" তবে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের দোসরদের সমস্ত প্রার্থনা ব্যর্থ করে দিয়ে গাজার মজলুম মানুষের সমর্থিত স্পেনই শেষ পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে বিজয়ের হাসে হাসে।

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেনের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জনকে চরম উল্লাসের সাথে উদযাপন করেছে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিরা। ইসরাইলি বর্বর আগ্রাসন, স্থায়ী বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং তীব্র ইন্টারনেট সংকটের কারণে ঘরে বসে খেলা দেখার সুযোগ না থাকায় হাজার হাজার গাজাবাসী ক্যাফে, রাস্তা এবং উন্মুক্ত স্কয়ারে প্রজেক্টরের সামনে জড়ো হন। স্পেনের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান এবং স্প্যানিশ তারকা লামিন ইয়ামালের ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির কারণে এই ফাইনালে গাজাবাসী স্পেনের পক্ষে বুক বেঁধেছিলেন, যা রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর পর এক অভূতপূর্ব বিজয়ানন্দে রূপ নেয়।
দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর লাগাতার বোমাবর্ষণ, ধ্বংসযজ্ঞ এবং অবর্ণনীয় মানবিক সংকটের মাঝেও গাজা উপত্যকায় আজ দেখা গেছে এক টুকরো খুশির ঝলক। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের রোমাঞ্চকর ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে পরাজিত করে স্পেনের শিরোপা জয় ফিলিস্তিনিদের মুখে এনে দিয়েছে এক চিলতে হাসি।
দীর্ঘদিন ধরে চলা অবরোধ আর আগ্রাসনে গাজার বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রায়। ফলে নিজেদের তাঁবু বা ঘরে বসে খেলা দেখার কোনো উপায় ছিল না সাধারণ মানুষের। এই ম্যাচটি দেখার জন্য গাজার হাজার হাজার মানুষ উপত্যকার বিভিন্ন ক্যাফে, খোলা রাস্তা এবং শরণার্থী শিবিরের ধ্বংসাবশেষের মাঝে স্থাপিত অস্থায়ী বড় পর্দার সামনে ভিড় জমান। ম্যাচ জুড়ে টানটান উত্তেজনার পর যখন স্পেন জয়সূচক গোলটি করে এবং ম্যাচ শেষ হয়, তখন পুরো গাজা মুখরিত হয়ে ওঠে করতালি আর উল্লাসধ্বনিতে।
ম্যাচ শেষে আনাদোলু এজেন্সির সাথে আলাপকালে নোমান আবদুল্লাহ নামের এক ফিলিস্তিনি নাগরিক বলেন, "স্পেন দীর্ঘ বছর ধরে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তারা আমাদের ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। এই কারণে আমরা আজ সবাই মিলে স্পেনকে সমর্থন করতে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে এখানে সমবেত হয়েছিলাম।" তিনি আরও যোগ করেন, ফিলিস্তিনিরা মূলত শান্তিপ্রিয় জাতি এবং এই উদযাপনের মাধ্যমে তারা বিশ্বকে বার্তা দিতে চান যে—তারা শান্তি, সংহতি এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো স্বাধীনতাকামী জাতিগুলোর সাথে সর্বদা ঐক্যবদ্ধ।
আরেক গাজাবাসী হানি আবু জার্ক বলেন, ইসরাইলি হামলা, ধ্বংসলীলা ও কঠিন জীবনযাত্রার মধ্যেও বিশ্বকাপের এই ফাইনাল গাজাবাসীকে ক্ষণিকের জন্য হলেও বেঁচে থাকার নতুন মানসিক শক্তি ও মনোবল জুগিয়েছে। তিনি বলেন, "বিশ্বের যে প্রান্তেই হোক না কেন, যারা ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলে, আমরা তাদের ভালোবাসি। বিশেষ করে স্প্যানিশ তারকা ফুটবলার লামিন ইয়ামাল যেভাবে ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার প্রকাশ্য সমর্থন ও সংহতি জানিয়েছেন, তা গাজার তরুণদের হৃদয় জয় করেছে। মূলত ইয়ামাল ও স্পেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই আমরা আজ তাদের জন্য গলা ফাটিয়েছি।"
তাঁবুতে মানবেতর জীবনযাপন করা মাহমুদ দিয়াব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ফিলিস্তিন ইস্যু কোনো আঞ্চলিক বিষয় নয়, বরং এটি পৃথিবীর সমস্ত মুক্তিকামী ও বিবেকবান মানুষের একটি অভিন্ন লড়াই। গাজাবাসীর এই দুঃখকষ্টের মাঝে ফুটবল যেভাবে সবাইকে এক করেছে, ঠিক সেভাবেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ববাসীকে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
ইসরাইলি কূটনীতির পরাজয়
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, এই ফাইনালে মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও ছিল এক রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার কড়া সমালোচনা করায় স্পেনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তেল আবিব। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার উগ্রপন্থী মন্ত্রীরা ফাইনালে আর্জেন্টিনার কট্টর সমর্থন করেছিলেন।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, ইসরাইলে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত শিমন অ্যাক্সেল ওয়াহনিশ নেতানিয়াহুকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলির একটি অডিও বার্তা শুনিয়েছিলেন, যেখানে মিলি নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন—"আপনি আমার প্রকৃত বন্ধু, আপনি সবসময় আমাদের সমর্থন করেন। আপনি আর্জেন্টিনার পক্ষে আছেন শুনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।" জবাবে নেতানিয়াহু বলেছিলেন—"হাভিয়ের, তুমি একজন সত্যিকারের বন্ধু। আমরা আর্জেন্টিনার পাশে আছি।" তবে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের দোসরদের সমস্ত প্রার্থনা ব্যর্থ করে দিয়ে গাজার মজলুম মানুষের সমর্থিত স্পেনই শেষ পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে বিজয়ের হাসে হাসে।

আপনার মতামত লিখুন