মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
কওমী টাইমস

তৃতীয় আবদুর রহমানের শাসনামলে নির্মিত আলমোনাস্টের লা রিয়াল মসজিদটি শত আঘাত ও খ্রিস্টান আগ্রাসনের পরও অক্ষত রেখেছে তার ঐতিহাসিক মুসলিম পরিচয়; এখনও একটি স্তম্ভে দেদীপ্যমান রয়েছে পবিত্র কালেমা শরীফ

আন্দালুসীয়ার গৌরব: স্পেনে হাজার বছরের প্রাচীন মসজিদ আজও জানান দিচ্ছে ইসলামের সোনালী অতীত



আন্দালুসীয়ার গৌরব: স্পেনে হাজার বছরের প্রাচীন মসজিদ আজও জানান দিচ্ছে ইসলামের সোনালী অতীত

স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের হুয়েলভা প্রদেশের একটি পাহাড়ি গ্রামে অবস্থিত ১০০০ বছরেরও বেশি পুরনো ঐতিহাসিক ‘আলমোনাস্টের লা রিয়াল’ মসজিদটি ইউরোপের বুকে মুসলিম স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে টিকে রয়েছে। দশম শতাব্দীতে কর্ডোবার উমাইয়া খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমানের স্বর্ণযুগে নির্মিত এই মসজিদটি ইউরোপের একমাত্র গ্রামীণ মসজিদ, যা হাজার বছর পরেও তার আদি অবয়ব ও রূপ ধরে রেখেছে। দীর্ঘ শতাব্দীব্যাপী খ্রিস্টান শাসকদের রূপান্তর ও ভাঙচুরের পরও এই মসজিদের কলামে আজও খোদাই করা রয়েছে মুসলিম উম্মাহর মূল ভিত্তি—"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ"।

ইউরোপের মাটিতে মুসলিম শাসনের দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস জড়িয়ে আছে তৎকালীন এন্ডালুশিয়ায় (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল)। ৭১১ থেকে ১৪৯২ ঈসায়ী সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় আটশত বছর এই অঞ্চলে ইসলামের আলো ছড়িয়েছিল। সেই আন্দালুসীয় ইসলামিক আমলের অনন্য স্থাপত্যশৈলীর এক বিস্ময়কর নিদর্শন স্পেনের হুয়েলভা (Huelva) শহরের পাহাড়ি অঞ্চলের আলমোনাস্টের লা রিয়াল মসজিদ। প্রাকৃতিক পার্কের এক বিশাল মনোরম পরিবেশের চূড়ায় অবস্থিত এই মসজিদটি বর্তমানে ইউরোপের বুকে সবচেয়ে প্রাচীন এবং সম্পূর্ণ অক্ষত গ্রামীণ মসজিদ হিসেবে বিবেচিত।

ইতিহাস ও রূপান্তরের ক্ষত

ইতিহাসবিদদের মতে, মসজিদটি নবম ও দশম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে উমাইয়া খিলাফতের সবচেয়ে সফল শাসক খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমানের শাসনামলে নির্মিত হয়। প্রায় চার শতাব্দী ধরে এটি মুসলিমদের প্রধান ইবাদতগাহ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যখন খ্রিস্টানরা এই অঞ্চল পুনর্দখল করে, তখন এই মসজিদটিকে চার্চ বা গির্জায় রূপান্তর করা হয়। কিন্তু শত প্রতিকূলতা, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং কাঠামোগত ভাঙচুরের পরেও এই স্থাপনাটি তার ভেতরের ইসলামিক সত্তা ও আত্মাকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেনি। রোমান ও ভিসিগোথ আমলের স্তম্ভ এবং উমাইয়া ধাঁচের ঘোড়ার ক্ষুরের ন্যায় খিলানগুলো আজও তৎকালীন মুসলিম স্থাপত্যের উচ্চমানের প্রমাণ দেয়।

হাজার বছর ধরে জ্বলজ্বল করছে তাওহীদের বাণী

এই মসজিদের সবচেয়ে বড় অলৌকিক ও আবেগঘন দৃশ্য হলো এর একটি প্রধান স্তম্ভে খোদাই করে লেখা পবিত্র কালেমা— "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ"। প্রায় ৩৮ বছর আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা স্পেনের সাবেক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রাফায়েল হার্নান্দেজ মাঞ্চা আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন,

"আমি যখনই এই মসজিদে প্রবেশ করি, মনে হয় আমি টাইমি মেশিনে করে অতীতে ফিরে গেছি। এখানে ঢোকার সাথে সাথেই যে স্তম্ভটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সেখানে হাজার বছর পরেও পরিষ্কারভাবে তাওহীদের বাণী খোদাই করা আছে। ক্যাথলিক রাজারা এর অনেক ক্ষতি করার চেষ্টা করলেও আল্লাহ তাআলা এই নিদর্শনটি বাঁচিয়ে রেখেছেন।"

স্পেনীয় ভাষায় আরবির গভীর প্রভাব

অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষক আরও উল্লেখ করেন যে, আন্দালুসিয়ার মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব কেবল স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আধুনিক স্প্যানিশ ভাষার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। স্প্যানিশ ডিকশনারির প্রায় ১০ শতাংশ শব্দই সরাসরি আরবি ভাষা থেকে এসেছে। আলমোনাস্টের, সেভিল, কর্ডোবা, গ্রানাডা, তোলেদোর মতো শত শত শহরের নাম এবং এমনকি স্পেনের বর্তমান বিশ্বখ্যাত টেনিস তারকা কার্লোস আলকারাজের (Carlos Alcaraz) উপাধিও আরবি শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ 'চেরি'। স্পেনে এখন আরবি নাম রাখা এক ধরনের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।

ভ্যান্ডালিজমমুক্ত সম্প্রীতির কেন্দ্র

আলমোনাস্টের লা রিয়াল পৌরসভার পর্যটন ও সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মকর্তা মারিয়া জোসে মার্টিন আনার্তে (Maria Jose Martin Anarte) জানান, এই মসজিদটি স্থানীয় জনগণের কাছে তাদের নিজেদের ঘরের মতোই প্রিয়। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লক্ষাধিক পর্যটক এটি দেখতে আসেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি উন্মুক্ত থাকলেও এখানে কখনো কোনো ধরনের বর্ণবাদী বা উগ্রপন্থী হামলা কিংবা ভাঙচুর (Vandalism) ঘটেনি।

আনার্তে আরও স্পষ্ট করে বলেন,

"এখানে বর্তমানে নিয়মিত খ্রিস্টান বা অন্য কোনো ধর্মীয় আচার পালন হয় না। তবে কোনো মুসলিম যদি এখানে এসে তাঁর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ আদায় করতে চান, তাতে কোনো প্রকার বাধা বা নিষেধাজ্ঞা নেই। গত ২৫ বছর ধরে প্রতি অক্টোবর মাসে আমরা এখানে 'ইসলামিক কালচারাল ডেস' উদযাপন করি, যেখানে গ্রানাডা, সেভিল ও মাদ্রিদ থেকে ইসলামিক স্কলার ও গবেষকরা আসেন। এই দিনগুলোতে মুসলিমরা এখানে সমবেত হয়ে জামায়াতের সাথে সালাত আদায় করেন। এটি মূলত আমাদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক মিলনমেলা।"

ইউরোপের বুকে ইসলামোফোবিয়া ও উগ্র ডানপন্থীদের ক্রমবর্ধমান মুসলিম বিদ্বেষের মাঝে স্পেনের এই ঐতিহাসিক মসজিদটি প্রমাণ করে যে, ইসলামের সোনালী অতীতকে মুছে ফেলা অসম্ভব এবং এটি আজও বিশ্ববাসীর জন্য শান্তি ও সম্প্রীতির এক অনন্য বাতিঘর।

বিষয় : স্পেন আন্দালুসিয়া

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬


আন্দালুসীয়ার গৌরব: স্পেনে হাজার বছরের প্রাচীন মসজিদ আজও জানান দিচ্ছে ইসলামের সোনালী অতীত

প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬

featured Image

স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের হুয়েলভা প্রদেশের একটি পাহাড়ি গ্রামে অবস্থিত ১০০০ বছরেরও বেশি পুরনো ঐতিহাসিক ‘আলমোনাস্টের লা রিয়াল’ মসজিদটি ইউরোপের বুকে মুসলিম স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে টিকে রয়েছে। দশম শতাব্দীতে কর্ডোবার উমাইয়া খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমানের স্বর্ণযুগে নির্মিত এই মসজিদটি ইউরোপের একমাত্র গ্রামীণ মসজিদ, যা হাজার বছর পরেও তার আদি অবয়ব ও রূপ ধরে রেখেছে। দীর্ঘ শতাব্দীব্যাপী খ্রিস্টান শাসকদের রূপান্তর ও ভাঙচুরের পরও এই মসজিদের কলামে আজও খোদাই করা রয়েছে মুসলিম উম্মাহর মূল ভিত্তি—"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ"।

ইউরোপের মাটিতে মুসলিম শাসনের দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস জড়িয়ে আছে তৎকালীন এন্ডালুশিয়ায় (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল)। ৭১১ থেকে ১৪৯২ ঈসায়ী সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় আটশত বছর এই অঞ্চলে ইসলামের আলো ছড়িয়েছিল। সেই আন্দালুসীয় ইসলামিক আমলের অনন্য স্থাপত্যশৈলীর এক বিস্ময়কর নিদর্শন স্পেনের হুয়েলভা (Huelva) শহরের পাহাড়ি অঞ্চলের আলমোনাস্টের লা রিয়াল মসজিদ। প্রাকৃতিক পার্কের এক বিশাল মনোরম পরিবেশের চূড়ায় অবস্থিত এই মসজিদটি বর্তমানে ইউরোপের বুকে সবচেয়ে প্রাচীন এবং সম্পূর্ণ অক্ষত গ্রামীণ মসজিদ হিসেবে বিবেচিত।

ইতিহাস ও রূপান্তরের ক্ষত

ইতিহাসবিদদের মতে, মসজিদটি নবম ও দশম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে উমাইয়া খিলাফতের সবচেয়ে সফল শাসক খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমানের শাসনামলে নির্মিত হয়। প্রায় চার শতাব্দী ধরে এটি মুসলিমদের প্রধান ইবাদতগাহ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যখন খ্রিস্টানরা এই অঞ্চল পুনর্দখল করে, তখন এই মসজিদটিকে চার্চ বা গির্জায় রূপান্তর করা হয়। কিন্তু শত প্রতিকূলতা, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং কাঠামোগত ভাঙচুরের পরেও এই স্থাপনাটি তার ভেতরের ইসলামিক সত্তা ও আত্মাকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেনি। রোমান ও ভিসিগোথ আমলের স্তম্ভ এবং উমাইয়া ধাঁচের ঘোড়ার ক্ষুরের ন্যায় খিলানগুলো আজও তৎকালীন মুসলিম স্থাপত্যের উচ্চমানের প্রমাণ দেয়।

হাজার বছর ধরে জ্বলজ্বল করছে তাওহীদের বাণী

এই মসজিদের সবচেয়ে বড় অলৌকিক ও আবেগঘন দৃশ্য হলো এর একটি প্রধান স্তম্ভে খোদাই করে লেখা পবিত্র কালেমা— "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ"। প্রায় ৩৮ বছর আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা স্পেনের সাবেক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রাফায়েল হার্নান্দেজ মাঞ্চা আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন,

"আমি যখনই এই মসজিদে প্রবেশ করি, মনে হয় আমি টাইমি মেশিনে করে অতীতে ফিরে গেছি। এখানে ঢোকার সাথে সাথেই যে স্তম্ভটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সেখানে হাজার বছর পরেও পরিষ্কারভাবে তাওহীদের বাণী খোদাই করা আছে। ক্যাথলিক রাজারা এর অনেক ক্ষতি করার চেষ্টা করলেও আল্লাহ তাআলা এই নিদর্শনটি বাঁচিয়ে রেখেছেন।"

স্পেনীয় ভাষায় আরবির গভীর প্রভাব

অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষক আরও উল্লেখ করেন যে, আন্দালুসিয়ার মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব কেবল স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আধুনিক স্প্যানিশ ভাষার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। স্প্যানিশ ডিকশনারির প্রায় ১০ শতাংশ শব্দই সরাসরি আরবি ভাষা থেকে এসেছে। আলমোনাস্টের, সেভিল, কর্ডোবা, গ্রানাডা, তোলেদোর মতো শত শত শহরের নাম এবং এমনকি স্পেনের বর্তমান বিশ্বখ্যাত টেনিস তারকা কার্লোস আলকারাজের (Carlos Alcaraz) উপাধিও আরবি শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ 'চেরি'। স্পেনে এখন আরবি নাম রাখা এক ধরনের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।

ভ্যান্ডালিজমমুক্ত সম্প্রীতির কেন্দ্র

আলমোনাস্টের লা রিয়াল পৌরসভার পর্যটন ও সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মকর্তা মারিয়া জোসে মার্টিন আনার্তে (Maria Jose Martin Anarte) জানান, এই মসজিদটি স্থানীয় জনগণের কাছে তাদের নিজেদের ঘরের মতোই প্রিয়। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লক্ষাধিক পর্যটক এটি দেখতে আসেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি উন্মুক্ত থাকলেও এখানে কখনো কোনো ধরনের বর্ণবাদী বা উগ্রপন্থী হামলা কিংবা ভাঙচুর (Vandalism) ঘটেনি।

আনার্তে আরও স্পষ্ট করে বলেন,

"এখানে বর্তমানে নিয়মিত খ্রিস্টান বা অন্য কোনো ধর্মীয় আচার পালন হয় না। তবে কোনো মুসলিম যদি এখানে এসে তাঁর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ আদায় করতে চান, তাতে কোনো প্রকার বাধা বা নিষেধাজ্ঞা নেই। গত ২৫ বছর ধরে প্রতি অক্টোবর মাসে আমরা এখানে 'ইসলামিক কালচারাল ডেস' উদযাপন করি, যেখানে গ্রানাডা, সেভিল ও মাদ্রিদ থেকে ইসলামিক স্কলার ও গবেষকরা আসেন। এই দিনগুলোতে মুসলিমরা এখানে সমবেত হয়ে জামায়াতের সাথে সালাত আদায় করেন। এটি মূলত আমাদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক মিলনমেলা।"

ইউরোপের বুকে ইসলামোফোবিয়া ও উগ্র ডানপন্থীদের ক্রমবর্ধমান মুসলিম বিদ্বেষের মাঝে স্পেনের এই ঐতিহাসিক মসজিদটি প্রমাণ করে যে, ইসলামের সোনালী অতীতকে মুছে ফেলা অসম্ভব এবং এটি আজও বিশ্ববাসীর জন্য শান্তি ও সম্প্রীতির এক অনন্য বাতিঘর।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ