সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
কওমী টাইমস

শ্রেণিকক্ষে স্মার্টফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও ডিজিটাল আসক্তির কারণে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার চিরাচরিত পরিবেশ ও নৈতিক মানের চরম অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের যৌথ সচেতনতাই পারে এই সংকট থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে।

আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষার মান অবনমন ও সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার: সংকট ও উত্তরণের উপায়


রশিদ আহমদ
রশিদ আহমদ
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষার মান অবনমন ও সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার: সংকট ও উত্তরণের উপায়

আলিয়া মাদরাসাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার মান, নীতি-নৈতিকতা ও সার্বিক শৃঙ্খলা নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের চর্চা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ও গেমসের প্রতি মারাত্মক আসক্তি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল বিভিন্ন ভিডিও ও ছবির পেছনের মূল কারণ বিশ্লেষণ করে বিশিষ্ট শিক্ষাচিন্তক ও লেখক রশিদ আহমদ আলিয়া শিক্ষা ব্যবস্থার এই বর্তমান করুণ চিত্র ও তার নেপথ্যের কারণগুলো তুলে ধরেছেন। একই সাথে তিনি মাদরাসা প্রশাসন ও অভিভাবকদের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।

ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার যে মহৎ উদ্দেশ্য ও ইলমি ঐতিহ্য ছিল, আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে আজ তা মারাত্মক হুমকির মুখে। শিক্ষাবিদদের মতে, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের প্রভাব শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক—সবার মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রেণিকক্ষের পবিত্রতা ও পড়াশোনার প্রতি শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েরই চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

নেপথ্যের কারণসমূহ

আলিয়া মাদরাসার বর্তমান অবক্ষয় ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিচ্যুতির পেছনে মূল কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:

সোশ্যাল মিডিয়ার যথেচ্ছ ব্যবহার: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে নৈতিক অবক্ষয় মহামারি আকার ধারণ করেছে।

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের ফোন ব্যবহার: ক্লাসরুমে পাঠদানের সময় অনেক শিক্ষক স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। ফলে পাঠদানে তাঁদের মনোসংযোগ থাকে না। শিক্ষকদের এই আচরণ দেখে ছাত্ররাও শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন ব্যবহারে উৎসাহিত হয় এবং ভিডিও বা শর্টস ধারণ শুরু করে।

শিক্ষার্থীদের টিকটক ও রিলস আসক্তি: শিক্ষককে অনুসরণের মাধ্যমে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা বাড়িতে গিয়ে বইয়ের পাতায় মনোযোগ না দিয়ে টিকটক ও ফেসবুকে রিলস ভিডিও বানানোয় মগ্ন থাকে।

ভিভাবকদের অসচেতনতা: অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া অভিভাবকদের নৈতিক অবক্ষয়েরই পরিচায়ক। অধ্যয়নকালে একজন শিক্ষার্থীর হাতে স্মার্টফোনের প্রয়োজনীয়তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

নলাইন গেমসের মারাত্মক প্রভাব: 'ফ্রি ফায়ার', 'পাবজি' বা 'ডিএলএস'-এর মতো অনলাইন গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ছে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা। এমনকি শ্রেণিকক্ষে বা পাড়া-মহল্লায় দলবদ্ধ হয়ে তারা এই ক্ষতিকারক গেমগুলোতে ডুবে থাকছে, যা সুশীল সমাজের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়।

শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতা ও অনিয়ম: ক্লাসে পূর্ণ ভলিউমে রিলস বা ভিডিও দেখা কিংবা মাদরাসায় উপস্থিতির ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করা শিক্ষকদের দৈনন্দিন আচরণে পরিণত হয়েছে। সঠিক সময়ে ক্লাসে না এসে মোবাইল স্ক্রিনে ডুবে থাকার ঘটনাও অহরহ ঘটছে।

উত্তরণের উপায় ও সুপারিশ

এই সংকটময় অবস্থা থেকে শিক্ষাঙ্গনকে মুক্ত করতে হলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবক উভয়কেই যৌথ ভূমিকা পালন করতে হবে:

শিক্ষকদের জন্য কঠোর নীতিমালা: ক্লাসে শিক্ষক যেন কোনোভাবেই স্মার্টফোন ব্যবহার না করেন, সে বিষয়ে প্রশাসনকে কঠোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা: মাদরাসা প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের জন্য মোবাইল ফোন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে। নিয়ম অমান্যকারীদের প্রয়োজনে বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ভিভাবক মিটিং ও সচেতনতা: সন্তানরা যেন বাড়িতে পড়ার সময়ে মোবাইল ফোন স্পর্শ করতে না পারে, সে ব্যাপারে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সাথে অভিভাবকদের নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমঝোতায় আসা জরুরি।

বিষয় : শিক্ষা আলিয়া মাদরাসা

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬


আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষার মান অবনমন ও সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার: সংকট ও উত্তরণের উপায়

প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

আলিয়া মাদরাসাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার মান, নীতি-নৈতিকতা ও সার্বিক শৃঙ্খলা নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের চর্চা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ও গেমসের প্রতি মারাত্মক আসক্তি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল বিভিন্ন ভিডিও ও ছবির পেছনের মূল কারণ বিশ্লেষণ করে বিশিষ্ট শিক্ষাচিন্তক ও লেখক রশিদ আহমদ আলিয়া শিক্ষা ব্যবস্থার এই বর্তমান করুণ চিত্র ও তার নেপথ্যের কারণগুলো তুলে ধরেছেন। একই সাথে তিনি মাদরাসা প্রশাসন ও অভিভাবকদের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।

ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার যে মহৎ উদ্দেশ্য ও ইলমি ঐতিহ্য ছিল, আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে আজ তা মারাত্মক হুমকির মুখে। শিক্ষাবিদদের মতে, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের প্রভাব শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক—সবার মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রেণিকক্ষের পবিত্রতা ও পড়াশোনার প্রতি শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েরই চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

নেপথ্যের কারণসমূহ

আলিয়া মাদরাসার বর্তমান অবক্ষয় ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিচ্যুতির পেছনে মূল কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:

সোশ্যাল মিডিয়ার যথেচ্ছ ব্যবহার: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে নৈতিক অবক্ষয় মহামারি আকার ধারণ করেছে।

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের ফোন ব্যবহার: ক্লাসরুমে পাঠদানের সময় অনেক শিক্ষক স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। ফলে পাঠদানে তাঁদের মনোসংযোগ থাকে না। শিক্ষকদের এই আচরণ দেখে ছাত্ররাও শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন ব্যবহারে উৎসাহিত হয় এবং ভিডিও বা শর্টস ধারণ শুরু করে।

শিক্ষার্থীদের টিকটক ও রিলস আসক্তি: শিক্ষককে অনুসরণের মাধ্যমে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা বাড়িতে গিয়ে বইয়ের পাতায় মনোযোগ না দিয়ে টিকটক ও ফেসবুকে রিলস ভিডিও বানানোয় মগ্ন থাকে।

ভিভাবকদের অসচেতনতা: অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া অভিভাবকদের নৈতিক অবক্ষয়েরই পরিচায়ক। অধ্যয়নকালে একজন শিক্ষার্থীর হাতে স্মার্টফোনের প্রয়োজনীয়তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

নলাইন গেমসের মারাত্মক প্রভাব: 'ফ্রি ফায়ার', 'পাবজি' বা 'ডিএলএস'-এর মতো অনলাইন গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ছে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা। এমনকি শ্রেণিকক্ষে বা পাড়া-মহল্লায় দলবদ্ধ হয়ে তারা এই ক্ষতিকারক গেমগুলোতে ডুবে থাকছে, যা সুশীল সমাজের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়।

শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতা ও অনিয়ম: ক্লাসে পূর্ণ ভলিউমে রিলস বা ভিডিও দেখা কিংবা মাদরাসায় উপস্থিতির ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করা শিক্ষকদের দৈনন্দিন আচরণে পরিণত হয়েছে। সঠিক সময়ে ক্লাসে না এসে মোবাইল স্ক্রিনে ডুবে থাকার ঘটনাও অহরহ ঘটছে।

উত্তরণের উপায় ও সুপারিশ

এই সংকটময় অবস্থা থেকে শিক্ষাঙ্গনকে মুক্ত করতে হলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবক উভয়কেই যৌথ ভূমিকা পালন করতে হবে:

শিক্ষকদের জন্য কঠোর নীতিমালা: ক্লাসে শিক্ষক যেন কোনোভাবেই স্মার্টফোন ব্যবহার না করেন, সে বিষয়ে প্রশাসনকে কঠোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা: মাদরাসা প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের জন্য মোবাইল ফোন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে। নিয়ম অমান্যকারীদের প্রয়োজনে বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ভিভাবক মিটিং ও সচেতনতা: সন্তানরা যেন বাড়িতে পড়ার সময়ে মোবাইল ফোন স্পর্শ করতে না পারে, সে ব্যাপারে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সাথে অভিভাবকদের নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমঝোতায় আসা জরুরি।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ