ভারতের মধ্যপ্রদেশের ছাতারপুর জেলায় এক মুসলিম নারীর মরদেহ স্বজনদের কাছে পৌঁছাতে ব্যবহার করা হয়েছে পৌরসভার আবর্জনা ফেলার ট্র্যাক্টর-ট্রলি। নিখোঁজের পর নিহত হওয়া রুকসানা খান নামের ওই নারীর ময়নাতদন্ত শেষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স দিতে ব্যর্থ হলে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। ভারতে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকার ও ন্যূনতম সম্মান পাওয়ার ক্ষেত্রে যে বৈষম্য ও ধস নেমেছে, এই ঘটনা তারই এক করুণ প্রতিফলন।
ভারতে সংখ্যালঘু ও সাধারণ নাগরিকদের মৃত্যুর পরও ন্যূনতম মর্যাদা না পাওয়ার এক নির্মম ও মর্মান্তিক চিত্র ফুটে উঠেছে মধ্যপ্রদেশের ছাতারপুর জেলায়। নিখোঁজের পর উদ্ধার হওয়া রুকসানা খান নামের এক মুসলিম নারীর মরদেহ ময়নাতদন্তের পর স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যবহৃত হয়েছে পুরসভার আবর্জনা বহনের কাজে নিয়োজিত ট্র্যাক্টর-ট্রলি। এই ঘটনার একটি তথ্যচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, রুকসানা খান গত ৪ জুলাই থেকে নিখোঁজ ছিলেন। গত ৫ আগস্ট সুরজপুর রোডের একটি ময়লার স্তূপের কাছ থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয় বড় মলহেরা সিভিল হাসপাতালে।
ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর রুকসানার পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে একটি শববাহী গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেও কোনো সহযোগিতা পায়নি। নিহত নারীর স্বামী বাবলেশ অহিরওয়ার জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করানোর পর হাসপাতাল ও স্থানীয় প্রশাসন তাঁদের হাতে কোনো অ্যাম্বুলেন্স তুলে না দিয়ে আবর্জনা পরিষ্কারের কাজে ব্যবহৃত একটি পৌর ট্র্যাক্টর-ট্রলি এনে দেয়। বাধ্য হয়ে শেষযাত্রায় সেই ময়লার গাড়িতে করেই রুকসানার মরদেহ নিয়ে যেতে হয় পরিবারটিকে।
ঘটনার বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের প্রতিষ্ঠানে কোনো নির্দিষ্ট লাশবাহী গাড়ি নেই; কারণ এ সংক্রান্ত কোনো বাজেট বা প্রশাসনিক অনুমোদন কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার থেকে বরাদ্দ করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে স্বাস্থ্যখাত ও প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যর্থতা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। ছাতারপুরের জেলা সংগ্রাহক (কালেক্টর) মৃণাল মিনা জানিয়েছেন, মুখ্য চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (CMHO) এবং উপ-বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট (SDM)-এর তদন্তের পর স্থানীয় ব্লক মেডিকেল অফিসারকে (BMO) বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত লজ্জাজনক ও মানবিকতাহীন’ হিসেবে বর্ণনা করে মধ্যপ্রদেশের বিরোধীদলীয় নেতা উমাং সিঙ্গার বলেন, “যে বিজেপি সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মতো বড় বড় গল্প শোনান, তাঁদের জবাব দেওয়া উচিত—এটাই কি রাজ্যের স্বাস্থ্য সেবার আসল মডেল? মৃত্যুর পর একটি মানুষের ন্যূনতম সম্মান পাওয়ার অধিকারও কুরে কুরে খাচ্ছে এই সরকারের প্রশাসনিক অবহেলা।”
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রদেশে স্বাস্থ্য খাতের এই বিপর্যয় ও অবহেলার ঘটনা নতুন নয়। গত ২৭ জুলাই মান্ডলা জেলায় ২১ বছর বয়সী এক ডায়ালাইসিস রোগী সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেনের অভাবে মারা যান। একই মাসের শুরুর দিকে, মান্ডলার বিছিয়া ব্লকে ১০৮ অ্যাম্বুলেন্স সময়ে না পৌঁছানোয় এক নারী অটোরিকশার ভেতরেই চার সন্তানের জন্ম দেন, যাদের পরবর্তীতে প্রিম্যাচিউর হওয়ার কারণে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এর আগে জানুয়ারি মাসে সাতনায় অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের দরজা আটকে যাওয়ায় ৬৭ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ চিকিৎসার অভাবে মারা যান।
ভারতে মানবাধিকার সুরক্ষা, বিশেষ করে মুসলিম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে। একটি সভ্য সমাজে মৃত্যুর পরও নাগরিকের সম্মানহানির এই সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬
ভারতের মধ্যপ্রদেশের ছাতারপুর জেলায় এক মুসলিম নারীর মরদেহ স্বজনদের কাছে পৌঁছাতে ব্যবহার করা হয়েছে পৌরসভার আবর্জনা ফেলার ট্র্যাক্টর-ট্রলি। নিখোঁজের পর নিহত হওয়া রুকসানা খান নামের ওই নারীর ময়নাতদন্ত শেষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স দিতে ব্যর্থ হলে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। ভারতে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকার ও ন্যূনতম সম্মান পাওয়ার ক্ষেত্রে যে বৈষম্য ও ধস নেমেছে, এই ঘটনা তারই এক করুণ প্রতিফলন।
ভারতে সংখ্যালঘু ও সাধারণ নাগরিকদের মৃত্যুর পরও ন্যূনতম মর্যাদা না পাওয়ার এক নির্মম ও মর্মান্তিক চিত্র ফুটে উঠেছে মধ্যপ্রদেশের ছাতারপুর জেলায়। নিখোঁজের পর উদ্ধার হওয়া রুকসানা খান নামের এক মুসলিম নারীর মরদেহ ময়নাতদন্তের পর স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যবহৃত হয়েছে পুরসভার আবর্জনা বহনের কাজে নিয়োজিত ট্র্যাক্টর-ট্রলি। এই ঘটনার একটি তথ্যচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, রুকসানা খান গত ৪ জুলাই থেকে নিখোঁজ ছিলেন। গত ৫ আগস্ট সুরজপুর রোডের একটি ময়লার স্তূপের কাছ থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয় বড় মলহেরা সিভিল হাসপাতালে।
ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর রুকসানার পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে একটি শববাহী গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেও কোনো সহযোগিতা পায়নি। নিহত নারীর স্বামী বাবলেশ অহিরওয়ার জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করানোর পর হাসপাতাল ও স্থানীয় প্রশাসন তাঁদের হাতে কোনো অ্যাম্বুলেন্স তুলে না দিয়ে আবর্জনা পরিষ্কারের কাজে ব্যবহৃত একটি পৌর ট্র্যাক্টর-ট্রলি এনে দেয়। বাধ্য হয়ে শেষযাত্রায় সেই ময়লার গাড়িতে করেই রুকসানার মরদেহ নিয়ে যেতে হয় পরিবারটিকে।
ঘটনার বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের প্রতিষ্ঠানে কোনো নির্দিষ্ট লাশবাহী গাড়ি নেই; কারণ এ সংক্রান্ত কোনো বাজেট বা প্রশাসনিক অনুমোদন কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার থেকে বরাদ্দ করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে স্বাস্থ্যখাত ও প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যর্থতা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। ছাতারপুরের জেলা সংগ্রাহক (কালেক্টর) মৃণাল মিনা জানিয়েছেন, মুখ্য চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (CMHO) এবং উপ-বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট (SDM)-এর তদন্তের পর স্থানীয় ব্লক মেডিকেল অফিসারকে (BMO) বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত লজ্জাজনক ও মানবিকতাহীন’ হিসেবে বর্ণনা করে মধ্যপ্রদেশের বিরোধীদলীয় নেতা উমাং সিঙ্গার বলেন, “যে বিজেপি সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মতো বড় বড় গল্প শোনান, তাঁদের জবাব দেওয়া উচিত—এটাই কি রাজ্যের স্বাস্থ্য সেবার আসল মডেল? মৃত্যুর পর একটি মানুষের ন্যূনতম সম্মান পাওয়ার অধিকারও কুরে কুরে খাচ্ছে এই সরকারের প্রশাসনিক অবহেলা।”
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রদেশে স্বাস্থ্য খাতের এই বিপর্যয় ও অবহেলার ঘটনা নতুন নয়। গত ২৭ জুলাই মান্ডলা জেলায় ২১ বছর বয়সী এক ডায়ালাইসিস রোগী সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেনের অভাবে মারা যান। একই মাসের শুরুর দিকে, মান্ডলার বিছিয়া ব্লকে ১০৮ অ্যাম্বুলেন্স সময়ে না পৌঁছানোয় এক নারী অটোরিকশার ভেতরেই চার সন্তানের জন্ম দেন, যাদের পরবর্তীতে প্রিম্যাচিউর হওয়ার কারণে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এর আগে জানুয়ারি মাসে সাতনায় অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের দরজা আটকে যাওয়ায় ৬৭ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ চিকিৎসার অভাবে মারা যান।
ভারতে মানবাধিকার সুরক্ষা, বিশেষ করে মুসলিম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে। একটি সভ্য সমাজে মৃত্যুর পরও নাগরিকের সম্মানহানির এই সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন