ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লা থেকে যৌথভাবে জাতীয় গীত ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়ার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে নতুন করে তীব্র তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই বিতর্কের জবাবে সমাজবাদী পার্টির (এসপি) মহারাষ্ট্রের রাজ্য সভাপতি ও প্রভাবশালী বিধায়ক আবু আসিম আজমি স্পষ্ট ভাষায় নিজ দলের অবস্থান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা তুলে ধরেছেন।
মুম্বাইয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবু আজমি বলেন, “যারা বন্দে মাতরম্ গাইতে চায়, তারা গাইতে পারে। এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই, আমরা তাদের গান শুনব। কিন্তু যারা ইসলাম ও শরিয়তের বিধান মেনে চলে, তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উপাসনা বা বন্দনা করতে পারে না। এটি তাদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। আপনি কি তাদের ওপর জোরপূর্বক অন্য কিছু চাপিয়ে দিয়ে ধর্মত্যাগে বাধ্য করবেন?”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো দেশে নাগরিকদের নিজ নিজ ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাস রক্ষা করার অধিকার থাকা উচিত এবং কোনো অবস্থাতেই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা উচিত নয়।
আদালত ও সংবিধানে বিশ্বাসের কথা
বন্দে মাতরম্ গাওয়াকে বাধ্যতামূলক করার সম্ভাব্য প্রচেষ্টা প্রসঙ্গে আজমি বলেন, নির্বাচিত সরকারের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থাকলেও যেকোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আইনসভা ও সংসদে আলোচনার দাবি রাখে। তিনি বলেন, “যদি কোনো কিছু মানুষের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে দেশে আইন ও বিচারব্যবস্থা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আদালতই দেবে।”
সন্ত্রাসবাদ ও নিরপরাধ মুসলিমদের হয়রানি
একই সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে কথা বলেন এই মুসলিম নেতা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রকৃত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার শিথিলতা দেখানো উচিত নয়।
“সন্ত্রাসী যে-ই হোক, তা সে পাকিস্তানভিত্তিক কোনো গোষ্ঠী বা আল-কায়েদার মতো সংগঠনের সাথে যুক্ত হোক না কেন—তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও আমাদের কোনো আপত্তি নেই,” বলেন আজমি।
তবে তিনি বেআইনিভাবে বা শুধু সন্দেহবশত নিরপরাধ মুসলিম তরুণদের গ্রেপ্তারের তীব্র বিরোধিতা করেন। মুম্বাই ধারাবাহিক বোমা হামলাসহ একাধিক ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক শিক্ষিত ও নিরপরাধ মুসলিম যুবককে আল-কায়েদা বা অন্যান্য সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার ভুয়া অভিযোগে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ না পাওয়ায় আদালত খালাস দিয়েছে।
আজমি প্রশ্ন তোলেন, “আদালত তাদের নিরপরাধ ঘোষণা করলেও যে বছরগুলো তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেল, তা কে ফিরিয়ে দেবে?”
ধর্মীয় বিভাজন ও মুসলিমদের টার্গেট করার অভিযোগ
কেন্দ্রীয় সরকারের এফসিআরএ (FCRA) বিল এবং অন্যান্য সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করে আজমি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার মূল উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দৃষ্টি সরাতে এবং রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে বারবার সংখ্যালঘু মুসলিমদের টার্গেট করছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ট্রিপল তালাক, বন্দে মাতরম্ এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধির (UCC) মতো বিষয়গুলো সামনে এনে মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কোনঠাসা করার চেষ্টা চলছে। তার মতে, “উন্নয়নের চেয়ে ভোটব্যাংক নিশ্চিত করতেই এসব বিষয় বারবার উসকে দেওয়া হচ্ছে।”
প্রবীণ এসপি নেতা আজম খানের দল ছাড়ার গুঞ্জন খারিজ করে আজমি বলেন, দলে আজম খানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। এ ছাড়া ভারতের মুসলিম ভোটারদের সচেতনতা নিয়ে তিনি বলেন, “মুসলিমরা কেবল প্রার্থীর ধর্মের ওপর ভিত্তি করে ভোট দেয় না। তারা সংবিধান এবং দলের আদর্শের ওপর আস্থা রেখে সিদ্ধান্ত নেয়। সমাজবাদী পার্টি সাংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষা করে বলেই মুসলিম সমাজ এসপি-কে সমর্থন দেয়।”
মারাঠি ভাষার বাধ্যবাধকতা ও অভিবাসীদের সুরক্ষা
মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটো-রিকশা চালকদের জন্য মারাঠি ভাষা জানা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রসঙ্গে আজমি বলেন, তিনি ইতোমধ্যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে কথা বলেছেন। অন্য রাজ্য বা শহর থেকে রুটি-রুজির সন্ধানে আসা অভিবাসীরা যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ভাষা শেখার জন্য নতুনদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিত বলেও মত ব্যক্ত করেন এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ।

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬
ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লা থেকে যৌথভাবে জাতীয় গীত ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়ার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে নতুন করে তীব্র তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই বিতর্কের জবাবে সমাজবাদী পার্টির (এসপি) মহারাষ্ট্রের রাজ্য সভাপতি ও প্রভাবশালী বিধায়ক আবু আসিম আজমি স্পষ্ট ভাষায় নিজ দলের অবস্থান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা তুলে ধরেছেন।
মুম্বাইয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবু আজমি বলেন, “যারা বন্দে মাতরম্ গাইতে চায়, তারা গাইতে পারে। এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই, আমরা তাদের গান শুনব। কিন্তু যারা ইসলাম ও শরিয়তের বিধান মেনে চলে, তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উপাসনা বা বন্দনা করতে পারে না। এটি তাদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। আপনি কি তাদের ওপর জোরপূর্বক অন্য কিছু চাপিয়ে দিয়ে ধর্মত্যাগে বাধ্য করবেন?”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো দেশে নাগরিকদের নিজ নিজ ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাস রক্ষা করার অধিকার থাকা উচিত এবং কোনো অবস্থাতেই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা উচিত নয়।
আদালত ও সংবিধানে বিশ্বাসের কথা
বন্দে মাতরম্ গাওয়াকে বাধ্যতামূলক করার সম্ভাব্য প্রচেষ্টা প্রসঙ্গে আজমি বলেন, নির্বাচিত সরকারের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থাকলেও যেকোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আইনসভা ও সংসদে আলোচনার দাবি রাখে। তিনি বলেন, “যদি কোনো কিছু মানুষের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে দেশে আইন ও বিচারব্যবস্থা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আদালতই দেবে।”
সন্ত্রাসবাদ ও নিরপরাধ মুসলিমদের হয়রানি
একই সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে কথা বলেন এই মুসলিম নেতা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রকৃত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার শিথিলতা দেখানো উচিত নয়।
“সন্ত্রাসী যে-ই হোক, তা সে পাকিস্তানভিত্তিক কোনো গোষ্ঠী বা আল-কায়েদার মতো সংগঠনের সাথে যুক্ত হোক না কেন—তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও আমাদের কোনো আপত্তি নেই,” বলেন আজমি।
তবে তিনি বেআইনিভাবে বা শুধু সন্দেহবশত নিরপরাধ মুসলিম তরুণদের গ্রেপ্তারের তীব্র বিরোধিতা করেন। মুম্বাই ধারাবাহিক বোমা হামলাসহ একাধিক ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক শিক্ষিত ও নিরপরাধ মুসলিম যুবককে আল-কায়েদা বা অন্যান্য সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার ভুয়া অভিযোগে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ না পাওয়ায় আদালত খালাস দিয়েছে।
আজমি প্রশ্ন তোলেন, “আদালত তাদের নিরপরাধ ঘোষণা করলেও যে বছরগুলো তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেল, তা কে ফিরিয়ে দেবে?”
ধর্মীয় বিভাজন ও মুসলিমদের টার্গেট করার অভিযোগ
কেন্দ্রীয় সরকারের এফসিআরএ (FCRA) বিল এবং অন্যান্য সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করে আজমি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার মূল উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দৃষ্টি সরাতে এবং রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে বারবার সংখ্যালঘু মুসলিমদের টার্গেট করছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ট্রিপল তালাক, বন্দে মাতরম্ এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধির (UCC) মতো বিষয়গুলো সামনে এনে মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কোনঠাসা করার চেষ্টা চলছে। তার মতে, “উন্নয়নের চেয়ে ভোটব্যাংক নিশ্চিত করতেই এসব বিষয় বারবার উসকে দেওয়া হচ্ছে।”
প্রবীণ এসপি নেতা আজম খানের দল ছাড়ার গুঞ্জন খারিজ করে আজমি বলেন, দলে আজম খানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। এ ছাড়া ভারতের মুসলিম ভোটারদের সচেতনতা নিয়ে তিনি বলেন, “মুসলিমরা কেবল প্রার্থীর ধর্মের ওপর ভিত্তি করে ভোট দেয় না। তারা সংবিধান এবং দলের আদর্শের ওপর আস্থা রেখে সিদ্ধান্ত নেয়। সমাজবাদী পার্টি সাংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষা করে বলেই মুসলিম সমাজ এসপি-কে সমর্থন দেয়।”
মারাঠি ভাষার বাধ্যবাধকতা ও অভিবাসীদের সুরক্ষা
মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটো-রিকশা চালকদের জন্য মারাঠি ভাষা জানা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রসঙ্গে আজমি বলেন, তিনি ইতোমধ্যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে কথা বলেছেন। অন্য রাজ্য বা শহর থেকে রুটি-রুজির সন্ধানে আসা অভিবাসীরা যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ভাষা শেখার জন্য নতুনদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিত বলেও মত ব্যক্ত করেন এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ।

আপনার মতামত লিখুন