মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

দক্ষিণ আফ্রিকার অভিযোগ, আইসিজের বাধ্যতামূলক অন্তর্বর্তী আদেশ মানতে ব্যর্থ হয়েছে ইসরায়েল। প্রিটোরিয়ার দাবি, এতে আদালতের সুরক্ষামূলক ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক আইনের বিশ্বাসযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়ছে।

গাজা গণহত্যা বন্ধে আইসিজের আদেশ অমান্যের প্রমাণ আদালতে দিল দক্ষিণ আফ্রিকা


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাজা গণহত্যা বন্ধে আইসিজের আদেশ অমান্যের প্রমাণ আদালতে দিল দক্ষিণ আফ্রিকা

দক্ষিণ আফ্রিকা ২৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) একটি বিস্তারিত নথি জমা দিয়েছে। এতে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেছে, গাজায় গণহত্যা প্রতিরোধ এবং জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে আদালতের দেওয়া আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক অন্তর্বর্তী আদেশ ইসরায়েল অমান্য করছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, আদালতের আদেশ ইসরায়েলের জন্য বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও গণহত্যা থেকে ফিলিস্তিনি জনগণকে রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে। এর মধ্যে গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়াও অন্তর্ভুক্ত।

প্রিটোরিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি, মার্চ ও মে মাসে আইসিজে যে তিন দফা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা জারি করেছিল, ইসরায়েল সেগুলো মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে।

এসব আদেশের মধ্যে গণহত্যা কনভেনশনের অধীনে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের নির্দেশনা ছিল। পাশাপাশি গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করা, দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহর ধ্বংসকারী সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং জাতিসংঘের তদন্তকারীদের গাজায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ও আদালতের নির্দেশনায় ছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দুঃখজনকভাবে ইসরায়েল এসব আদেশ মেনে চলেনি। দেশটি জানিয়েছে, আদালতের আদেশ পুরোপুরি ও অবিলম্বে বাস্তবায়ন করাতে তারা তাদের হাতে থাকা সব আইনি পথ ব্যবহার করে যাচ্ছে।

গাজায় প্রাণহানি ও মানবিক পরিস্থিতির চিত্র

দক্ষিণ আফ্রিকার জমা দেওয়া নথিতে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান গণহত্যার অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় অন্তত ৭৩ হাজার ৪০৭ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩৩৫ জন আহত হয়েছেন।

নথিতে বলা হয়েছে, নিহত ও আহতের সম্মিলিত সংখ্যা গাজার মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও বেশি।

তবে গাজায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে বিভিন্ন হিসাবের কথা উল্লেখ করেছে প্রিটোরিয়া। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরোক্ষ প্রভাব বিবেচনায় কিছু অনুমানে নিহতের সংখ্যা কয়েক লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন গুরুতর কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বিচারে আটক, ব্যাপক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং গাজার গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাতের হার তিন গুণ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ।

কথিত যুদ্ধবিরতির পরও শিশুর মৃত্যু

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে কথিত যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হাতে ফিলিস্তিনি শিশুদের মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে বলে দক্ষিণ আফ্রিকার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

নথির দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গড়ে প্রতিদিন একজন ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করে আসছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার মতে, ইসরায়েলের এই চলমান অমান্যতা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বৈধতা ও কার্যকারিতাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে এটি ফিলিস্তিনি জনগণের আরও ধ্বংসের পথ তৈরি করছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, আদালতের জারি করা অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাগুলো মেনে চলতে ইসরায়েলের ব্যর্থতা এসব ব্যবস্থার সুরক্ষামূলক কার্যকারিতা দুর্বল করছে এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর আরও ধ্বংস ডেকে আনছে।

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ

প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি নেতারা গাজার প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাকে সরিয়ে দিয়ে অঞ্চলটি সংযুক্তকরণ ও সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের পথ তৈরি করতে চান বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ লক্ষ্য অর্জনে গাজায় জীবনকে এতটাই বিপজ্জনক ও অসহনীয় করে তোলার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, যাতে ফিলিস্তিনিরা তৃতীয় কোনো দেশে তথাকথিত ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ বেছে নিতে বাধ্য হন।

এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ আফ্রিকার বক্তব্য হলো, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের আদেশ কার্যকর না হলে গাজার ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষার জন্য বিদ্যমান আইনি কাঠামোর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকা তাই আইসিজের আদেশ বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। দেশটির অবস্থান অনুযায়ী, গণহত্যা প্রতিরোধ শুধু আদালতের আদেশ মানার বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি আইনগত ও নৈতিক দায়িত্বও।

বিষয় : গাজা ফিলিস্তিন দক্ষিণ আফ্রিকা

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


গাজা গণহত্যা বন্ধে আইসিজের আদেশ অমান্যের প্রমাণ আদালতে দিল দক্ষিণ আফ্রিকা

প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

দক্ষিণ আফ্রিকা ২৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) একটি বিস্তারিত নথি জমা দিয়েছে। এতে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেছে, গাজায় গণহত্যা প্রতিরোধ এবং জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে আদালতের দেওয়া আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক অন্তর্বর্তী আদেশ ইসরায়েল অমান্য করছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, আদালতের আদেশ ইসরায়েলের জন্য বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও গণহত্যা থেকে ফিলিস্তিনি জনগণকে রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে। এর মধ্যে গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়াও অন্তর্ভুক্ত।

প্রিটোরিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি, মার্চ ও মে মাসে আইসিজে যে তিন দফা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা জারি করেছিল, ইসরায়েল সেগুলো মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে।

এসব আদেশের মধ্যে গণহত্যা কনভেনশনের অধীনে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের নির্দেশনা ছিল। পাশাপাশি গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করা, দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহর ধ্বংসকারী সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং জাতিসংঘের তদন্তকারীদের গাজায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ও আদালতের নির্দেশনায় ছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দুঃখজনকভাবে ইসরায়েল এসব আদেশ মেনে চলেনি। দেশটি জানিয়েছে, আদালতের আদেশ পুরোপুরি ও অবিলম্বে বাস্তবায়ন করাতে তারা তাদের হাতে থাকা সব আইনি পথ ব্যবহার করে যাচ্ছে।

গাজায় প্রাণহানি ও মানবিক পরিস্থিতির চিত্র

দক্ষিণ আফ্রিকার জমা দেওয়া নথিতে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান গণহত্যার অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় অন্তত ৭৩ হাজার ৪০৭ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩৩৫ জন আহত হয়েছেন।

নথিতে বলা হয়েছে, নিহত ও আহতের সম্মিলিত সংখ্যা গাজার মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও বেশি।

তবে গাজায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে বিভিন্ন হিসাবের কথা উল্লেখ করেছে প্রিটোরিয়া। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরোক্ষ প্রভাব বিবেচনায় কিছু অনুমানে নিহতের সংখ্যা কয়েক লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন গুরুতর কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বিচারে আটক, ব্যাপক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং গাজার গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাতের হার তিন গুণ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ।

কথিত যুদ্ধবিরতির পরও শিশুর মৃত্যু

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে কথিত যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হাতে ফিলিস্তিনি শিশুদের মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে বলে দক্ষিণ আফ্রিকার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

নথির দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গড়ে প্রতিদিন একজন ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করে আসছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার মতে, ইসরায়েলের এই চলমান অমান্যতা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বৈধতা ও কার্যকারিতাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে এটি ফিলিস্তিনি জনগণের আরও ধ্বংসের পথ তৈরি করছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, আদালতের জারি করা অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাগুলো মেনে চলতে ইসরায়েলের ব্যর্থতা এসব ব্যবস্থার সুরক্ষামূলক কার্যকারিতা দুর্বল করছে এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর আরও ধ্বংস ডেকে আনছে।

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ

প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি নেতারা গাজার প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাকে সরিয়ে দিয়ে অঞ্চলটি সংযুক্তকরণ ও সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের পথ তৈরি করতে চান বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ লক্ষ্য অর্জনে গাজায় জীবনকে এতটাই বিপজ্জনক ও অসহনীয় করে তোলার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, যাতে ফিলিস্তিনিরা তৃতীয় কোনো দেশে তথাকথিত ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ বেছে নিতে বাধ্য হন।

এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ আফ্রিকার বক্তব্য হলো, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের আদেশ কার্যকর না হলে গাজার ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষার জন্য বিদ্যমান আইনি কাঠামোর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকা তাই আইসিজের আদেশ বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। দেশটির অবস্থান অনুযায়ী, গণহত্যা প্রতিরোধ শুধু আদালতের আদেশ মানার বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি আইনগত ও নৈতিক দায়িত্বও।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ