ভারতে গরুকে ‘জাতীয় পশু’ ঘোষণা এবং গো-হত্যার ওপর দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা জারির দাবিতে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের আহ্বানের মধ্যে এক ব্যতিক্রমী মন্তব্য করেছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। সোমবার (১ জুন) বিজনোরে এক জনসভায় তিনি জানান, গরুকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় পশু ঘোষণার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, ভারতীয় সংস্কৃতি ও সংস্কারে গরুর স্থান ‘মা’ এর সমতুল্য এবং মা ও সন্তানের সম্পর্কের জন্য কোনো সরকারি স্বীকৃতির প্রয়োজন হয় না।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের শীর্ষস্থানীয় মুসলিম সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে গরুকে জাতীয় পশু হিসেবে ঘোষণা করার দাবি ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই দাবির প্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক যুক্তি উপস্থাপন করেছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তথা কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা যোগী আদিত্যনাথ।
বিজনোরের এক জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে যোগী আদিত্যনাথ স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
"গরু আমাদের গো-মাতা এবং এই দেশ বা রাষ্ট্রেরও মাতা। মা এবং সন্তানের মধ্যকার পবিত্র সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে কি কোনো অফিশিয়াল বা প্রাতিষ্ঠানিক ঘোষণার প্রয়োজন আছে? কোনো সন্তানকে কি কখনো বলে দিতে হয় যে ইনি তোমার মা, তাই তাকে সম্মান করো?"
তিনি আরও যোগ করেন, "এটাই আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সংস্কার। গরু আমাদের কাছে কেবল কোনো চতুষ্পদ প্রাণী বা পশু নয়, সে আমাদের মা।" একই সাথে মুসলিম সংগঠনগুলোর এই জাতীয় পশুর মর্যাদার দাবিকে "ভণ্ডামি" এবং "পৈশাচিক মানসিকতার" বহিঃপ্রকাশ বলে তীব্র সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী।
চলতি বছরের পবিত্র ঈদুল আজহায় ভারতের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী ও ঐতিহাসিক মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান— যেমন আজমির দরগাহ শরিফ, কলকাতার নাখোদা মসজিদ এবং দিল্লির হযরত নিজামুদ্দিন দরগাহের পক্ষ থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি গরু কোরবানি বা উৎসর্গ করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। মূলত বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে গো-কোরবানি প্রতিরোধে দেওয়া হুমকির মুখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে এবং বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে মুসলিম নেতারা এই অনুরোধ জানান।
যোগী আদিত্যনাথের এই মন্তব্যের ঠিক এক দিন আগে ভারতের কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে গরুকে ‘জাতীয় পশু’ হিসেবে ঘোষণা করা কিংবা দেশজুড়ে গো-হত্যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কোনো সক্রিয় প্রস্তাব বা পরিকল্পনা বিবেচনাধীন নেই।
আইনমন্ত্রী বলেন, "এটি এমন একটি সংবেদনশীল বিষয় যা বিভিন্ন সামাজিক ও স্থানীয় সংগঠনগুলো প্রায়শই উত্থাপন করে থাকে। এই দাবি নিয়ে নানা মহলে প্রচেষ্টা ও আলোচনা চলছে ঠিকই, তবে বর্তমান সময়ে এটি এমন কোনো পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে সরকারের নীতিগত পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে।"
তবে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ আইনি কাঠামো এবং বহুত্ববাদী সমাজে কোনো ধর্মীয় আবেগকে আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপ দেওয়া এবং একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় আচার পালনের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বরাবরই একটি বড় আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রায়শই গো-রক্ষার নামে অতিউত্সাহী দলগুলোর দ্বারা সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর ঘটে যাওয়া সহিংসতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। মুসলিম সংগঠনগুলোর ত্যাগ স্বীকারের আহ্বানের পরও মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর মন্তব্য ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে জবাবদিহিতা ও বহুত্ববাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
ভারতে গো-রক্ষা এবং গো-হত্যা বন্ধের আন্দোলন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইস্যু। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন রাজ্যে গো-হত্যার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার (Mob) মতো ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলেও সমালোচিত হয়েছে। ২০২৬ সালের বকরিদকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলার অবনতি এড়াতেই মূলত মুসলিম সংগঠনগুলো স্বপ্রণোদিত হয়ে এই ছাড় দেওয়ার এবং জাতীয় পশুর স্বীকৃতির দাবি তুলেছিল।
গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে সম্প্রীতি রক্ষার স্বার্থে সব পক্ষের সংযত আচরণ কাম্য। একদিকে মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সংঘাত এড়ানোর সদিচ্ছা এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পদের ব্যক্তিদের মন্তব্য—এই দুইয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব ভারতের সামাজিক মেলবন্ধনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬
ভারতে গরুকে ‘জাতীয় পশু’ ঘোষণা এবং গো-হত্যার ওপর দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা জারির দাবিতে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের আহ্বানের মধ্যে এক ব্যতিক্রমী মন্তব্য করেছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। সোমবার (১ জুন) বিজনোরে এক জনসভায় তিনি জানান, গরুকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় পশু ঘোষণার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, ভারতীয় সংস্কৃতি ও সংস্কারে গরুর স্থান ‘মা’ এর সমতুল্য এবং মা ও সন্তানের সম্পর্কের জন্য কোনো সরকারি স্বীকৃতির প্রয়োজন হয় না।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের শীর্ষস্থানীয় মুসলিম সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে গরুকে জাতীয় পশু হিসেবে ঘোষণা করার দাবি ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই দাবির প্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক যুক্তি উপস্থাপন করেছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তথা কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা যোগী আদিত্যনাথ।
বিজনোরের এক জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে যোগী আদিত্যনাথ স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
"গরু আমাদের গো-মাতা এবং এই দেশ বা রাষ্ট্রেরও মাতা। মা এবং সন্তানের মধ্যকার পবিত্র সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে কি কোনো অফিশিয়াল বা প্রাতিষ্ঠানিক ঘোষণার প্রয়োজন আছে? কোনো সন্তানকে কি কখনো বলে দিতে হয় যে ইনি তোমার মা, তাই তাকে সম্মান করো?"
তিনি আরও যোগ করেন, "এটাই আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সংস্কার। গরু আমাদের কাছে কেবল কোনো চতুষ্পদ প্রাণী বা পশু নয়, সে আমাদের মা।" একই সাথে মুসলিম সংগঠনগুলোর এই জাতীয় পশুর মর্যাদার দাবিকে "ভণ্ডামি" এবং "পৈশাচিক মানসিকতার" বহিঃপ্রকাশ বলে তীব্র সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী।
চলতি বছরের পবিত্র ঈদুল আজহায় ভারতের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী ও ঐতিহাসিক মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান— যেমন আজমির দরগাহ শরিফ, কলকাতার নাখোদা মসজিদ এবং দিল্লির হযরত নিজামুদ্দিন দরগাহের পক্ষ থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি গরু কোরবানি বা উৎসর্গ করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। মূলত বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে গো-কোরবানি প্রতিরোধে দেওয়া হুমকির মুখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে এবং বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে মুসলিম নেতারা এই অনুরোধ জানান।
যোগী আদিত্যনাথের এই মন্তব্যের ঠিক এক দিন আগে ভারতের কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে গরুকে ‘জাতীয় পশু’ হিসেবে ঘোষণা করা কিংবা দেশজুড়ে গো-হত্যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কোনো সক্রিয় প্রস্তাব বা পরিকল্পনা বিবেচনাধীন নেই।
আইনমন্ত্রী বলেন, "এটি এমন একটি সংবেদনশীল বিষয় যা বিভিন্ন সামাজিক ও স্থানীয় সংগঠনগুলো প্রায়শই উত্থাপন করে থাকে। এই দাবি নিয়ে নানা মহলে প্রচেষ্টা ও আলোচনা চলছে ঠিকই, তবে বর্তমান সময়ে এটি এমন কোনো পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে সরকারের নীতিগত পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে।"
তবে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ আইনি কাঠামো এবং বহুত্ববাদী সমাজে কোনো ধর্মীয় আবেগকে আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপ দেওয়া এবং একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় আচার পালনের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বরাবরই একটি বড় আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রায়শই গো-রক্ষার নামে অতিউত্সাহী দলগুলোর দ্বারা সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর ঘটে যাওয়া সহিংসতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। মুসলিম সংগঠনগুলোর ত্যাগ স্বীকারের আহ্বানের পরও মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর মন্তব্য ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে জবাবদিহিতা ও বহুত্ববাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
ভারতে গো-রক্ষা এবং গো-হত্যা বন্ধের আন্দোলন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইস্যু। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন রাজ্যে গো-হত্যার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার (Mob) মতো ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলেও সমালোচিত হয়েছে। ২০২৬ সালের বকরিদকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলার অবনতি এড়াতেই মূলত মুসলিম সংগঠনগুলো স্বপ্রণোদিত হয়ে এই ছাড় দেওয়ার এবং জাতীয় পশুর স্বীকৃতির দাবি তুলেছিল।
গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে সম্প্রীতি রক্ষার স্বার্থে সব পক্ষের সংযত আচরণ কাম্য। একদিকে মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সংঘাত এড়ানোর সদিচ্ছা এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পদের ব্যক্তিদের মন্তব্য—এই দুইয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব ভারতের সামাজিক মেলবন্ধনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।

আপনার মতামত লিখুন