সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের ইদিলিব প্রদেশের আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে চালানো মঙ্গলবার রাতের ইসরায়েলি বিমান হামলাকে স্রেফ নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত স্টান্ট বলে আখ্যায়িত করেছে তুরস্ক। তুর্কি সীমান্ত থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই নিষ্ক্রিয় বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলের পরপর ৮টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এমন এক সময়ে পরিচালিত হলো, যার ঠিক কিছুদিন আগেই তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। আঙ্কারা ও দামেস্কের কূটনৈতিক সূত্রের মতে, সিরিয়াকে পুনর্গঠনে তুর্কি সহায়তাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে এবং অঞ্চলের সার্বভৌমত্বকে চরম বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইসরায়েল পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক বিপজ্জনক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
উত্তর সিরিয়ার কৌশলগত আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনাশের এক নগ্ন প্ররোচনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সিরীয় সরকারের সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মঙ্গলবার ভোরে উসকানিমূলকভাবে রানওয়ে লক্ষ্য করে মোট আটটি শক্তিশালী বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে রানওয়ে ও আশপাশের পরিকাঠামো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, সিরিয়া ও দখলদার ইসরায়েলের মধ্যে যে তথাকথিত "নিরাপত্তা স্থিতাবস্থা" রয়েছে, তা লঙ্ঘনের মুখোমুখি হয়েছিল—কারণ সিরিয়া সেখানে আলেপ্পোর কাছে তুর্কি বাহিনীকে মোতায়েনের অনুমতি দিচ্ছিল। তবে তুর্কি ও সিরীয় প্রশাসন এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট বলে খারিজ করে দিয়েছে।
পুনর্গঠন প্রচেষ্টা ও অশুভ চক্রান্ত: মিডল ইস্ট আই (MEE)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিরিয়ার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, বিমানঘাঁটিটিতে কোনো তুর্কি সামরিক সদস্যের স্থায়ী উপস্থিতি ছিল না। মূলত সিরিয়ার নতুন প্রশাসনের অধীনে জাতীয় অবকাঠামো পুনর্গঠন কাজের অংশ হিসেবে একটি তুর্কি কারিগরি/টেকনিক্যাল টিম রানওয়ে ও কন্ট্রোল টাওয়ার সংস্কারের কাজে নিয়োজিত ছিল। বিমান হামলার ঠিক দু'দিন আগেই টেকনিক্যাল টিমটি ঘাঁটি পরিদর্শনের কাজটি শেষ করে সেখান থেকে প্রস্থান করে।
কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, তুরস্ক কোনো সামরিক দখলদারিত্ব চালনা করছে না, বরং বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সার্বভৌম সামরিক কাঠামো হিসেবে গড়ে তুলতে কারিগরি ও অবকাঠামোগত সহায়তা দিচ্ছে।
'মক্কা চুক্তি' ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক রাজনৈতিক চাল: আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে সম্প্রতি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক 'মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি'। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আত্মরক্ষা ও প্রতিরক্ষা জোরদারে এই পারস্পরিক সামরিক চুক্তি নেতানিয়াহুর সম্প্রসারণবাদী ও উগ্র রাজনৈতিক এজেন্ডাকে আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণভাবে চরম কোণঠাসা করে ফেলেছে। ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে নিজের ইমেজ বাঁচাতে নেতানিয়াহু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানকে নিজের ‘প্রধান শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন এবং মুসলিম বিশ্বের এই নতুন জোটের গ্রহণযোগ্যতাকে ধাক্কা দিতে সিরিয়ার মাটিতে তুর্কি সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছেন।
আঙ্কারার কড়া বার্তা: ‘ইসরায়েল আগুন নিয়ে খেলছে’ তুর্কি প্রতিরক্ষা সূত্র এবং রাষ্ট্রপতির যোগাযোগ দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, হামলা প্রতিরোধে দুই দেশের সামরিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে যে দ্বিপাক্ষিক ‘হটলাইন’ সচল ছিল, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে তার ব্যবহার এড়িয়ে গেছে। এর মূল লক্ষ্য ছিল আঙ্কারাকে উস্কানি দেওয়া ও ভয় দেখানো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তুর্কি এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেন, "ইসরায়েল পরিষ্কারভাবে আঙ্কারাকে বার্তা দিতে চায় যে তারা সিরিয়ায় আমাদের সহায়তা বরদাশত করবে না। তবে তারা মূলতঃ আগুন নিয়ে খেলছে। আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ও রাডার সক্ষমতা জর্ডান সীমান্ত পর্যন্ত যেকোনো সামরিক তৎপরতা ট্র্যাকিংয়ে সক্ষম। আঙ্কারা অপ্রস্তুত নয়।"
এমনকি সিরিয়া ও তুরস্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন বিশেষ দূত টমাস ব্যারাকও ইসরায়েলি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বিমান হামলা সরাসরি তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে এক ভয়াবহ ও প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত উস্কে দেওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি করেছিল।
মুসলিম উম্মাহর ভূ-রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দখলদার ইসরায়েলি সরকারের এই উসকানিমূলক পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে এক নতুন উত্তেজনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
বিষয় : সিরিয়া মক্কা চুক্তি তুর্কি

বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের ইদিলিব প্রদেশের আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে চালানো মঙ্গলবার রাতের ইসরায়েলি বিমান হামলাকে স্রেফ নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত স্টান্ট বলে আখ্যায়িত করেছে তুরস্ক। তুর্কি সীমান্ত থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই নিষ্ক্রিয় বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলের পরপর ৮টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এমন এক সময়ে পরিচালিত হলো, যার ঠিক কিছুদিন আগেই তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। আঙ্কারা ও দামেস্কের কূটনৈতিক সূত্রের মতে, সিরিয়াকে পুনর্গঠনে তুর্কি সহায়তাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে এবং অঞ্চলের সার্বভৌমত্বকে চরম বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইসরায়েল পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক বিপজ্জনক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
উত্তর সিরিয়ার কৌশলগত আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনাশের এক নগ্ন প্ররোচনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সিরীয় সরকারের সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মঙ্গলবার ভোরে উসকানিমূলকভাবে রানওয়ে লক্ষ্য করে মোট আটটি শক্তিশালী বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে রানওয়ে ও আশপাশের পরিকাঠামো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, সিরিয়া ও দখলদার ইসরায়েলের মধ্যে যে তথাকথিত "নিরাপত্তা স্থিতাবস্থা" রয়েছে, তা লঙ্ঘনের মুখোমুখি হয়েছিল—কারণ সিরিয়া সেখানে আলেপ্পোর কাছে তুর্কি বাহিনীকে মোতায়েনের অনুমতি দিচ্ছিল। তবে তুর্কি ও সিরীয় প্রশাসন এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট বলে খারিজ করে দিয়েছে।
পুনর্গঠন প্রচেষ্টা ও অশুভ চক্রান্ত: মিডল ইস্ট আই (MEE)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিরিয়ার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, বিমানঘাঁটিটিতে কোনো তুর্কি সামরিক সদস্যের স্থায়ী উপস্থিতি ছিল না। মূলত সিরিয়ার নতুন প্রশাসনের অধীনে জাতীয় অবকাঠামো পুনর্গঠন কাজের অংশ হিসেবে একটি তুর্কি কারিগরি/টেকনিক্যাল টিম রানওয়ে ও কন্ট্রোল টাওয়ার সংস্কারের কাজে নিয়োজিত ছিল। বিমান হামলার ঠিক দু'দিন আগেই টেকনিক্যাল টিমটি ঘাঁটি পরিদর্শনের কাজটি শেষ করে সেখান থেকে প্রস্থান করে।
কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, তুরস্ক কোনো সামরিক দখলদারিত্ব চালনা করছে না, বরং বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সার্বভৌম সামরিক কাঠামো হিসেবে গড়ে তুলতে কারিগরি ও অবকাঠামোগত সহায়তা দিচ্ছে।
'মক্কা চুক্তি' ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক রাজনৈতিক চাল: আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে সম্প্রতি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক 'মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি'। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আত্মরক্ষা ও প্রতিরক্ষা জোরদারে এই পারস্পরিক সামরিক চুক্তি নেতানিয়াহুর সম্প্রসারণবাদী ও উগ্র রাজনৈতিক এজেন্ডাকে আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণভাবে চরম কোণঠাসা করে ফেলেছে। ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে নিজের ইমেজ বাঁচাতে নেতানিয়াহু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানকে নিজের ‘প্রধান শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন এবং মুসলিম বিশ্বের এই নতুন জোটের গ্রহণযোগ্যতাকে ধাক্কা দিতে সিরিয়ার মাটিতে তুর্কি সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছেন।
আঙ্কারার কড়া বার্তা: ‘ইসরায়েল আগুন নিয়ে খেলছে’ তুর্কি প্রতিরক্ষা সূত্র এবং রাষ্ট্রপতির যোগাযোগ দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, হামলা প্রতিরোধে দুই দেশের সামরিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে যে দ্বিপাক্ষিক ‘হটলাইন’ সচল ছিল, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে তার ব্যবহার এড়িয়ে গেছে। এর মূল লক্ষ্য ছিল আঙ্কারাকে উস্কানি দেওয়া ও ভয় দেখানো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তুর্কি এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেন, "ইসরায়েল পরিষ্কারভাবে আঙ্কারাকে বার্তা দিতে চায় যে তারা সিরিয়ায় আমাদের সহায়তা বরদাশত করবে না। তবে তারা মূলতঃ আগুন নিয়ে খেলছে। আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ও রাডার সক্ষমতা জর্ডান সীমান্ত পর্যন্ত যেকোনো সামরিক তৎপরতা ট্র্যাকিংয়ে সক্ষম। আঙ্কারা অপ্রস্তুত নয়।"
এমনকি সিরিয়া ও তুরস্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন বিশেষ দূত টমাস ব্যারাকও ইসরায়েলি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বিমান হামলা সরাসরি তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে এক ভয়াবহ ও প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত উস্কে দেওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি করেছিল।
মুসলিম উম্মাহর ভূ-রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দখলদার ইসরায়েলি সরকারের এই উসকানিমূলক পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে এক নতুন উত্তেজনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন