২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্মম গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা আরাকান বা রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংখ্যার ৯ বছর পর দাঁড়িয়েছে ১২ লাখে (১.২ মিলিয়ন)। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিক বৈষম্যের শিকার এই গোষ্ঠীটি ১৯৮২ সালের বিতর্কিত আইন এবং পরবর্তী সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় "উদ্বাস্তু" ও "অপনাগরিক" হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। কক্সবাজারের বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে মানবিক সংকটে দিন কাটানো এই জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু, যাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন আজও অনিশ্চিত।
আরাকানের (রাখাইন) নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ভূমিপুত্র এই মুসলিমরা ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালের পর থেকেই মিয়ানমার সামরিক শাসক ও চরমপন্থী গোষ্ঠীর ধারাবাহিক নিগ্রহের শিকার। ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তা ক্ষমতার জবরদখল নেওয়ার পর "ড্রাগন কিং" এবং "ক্লিন অ্যান্ড বিউটিফুল নেশন"-এর মতো সামরিক অভিযানের মাধ্যমে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত করার চক্রান্ত শুরু হয়।
১৯৮২ সালের বৈষম্যমূলক আইন ও ভোটাধিকার হরণ
মিয়ানমারের বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার ১৯৮২ সালে এক আইন প্রণয়ন করে দেশের ১৩৫টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিলেও আরাকানের মুসলিমদের ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেয়। এর ফলে তারা নিজ ভূমিতেই "রাষ্ট্রহীন" (Stateless) নাগরিকের মর্যাদায় পতিত হয়। ২০১৪ সালের প্রথম আনুষ্ঠানিক আদমশুমারি এবং ২০১৫ সালের নির্বাচনেও তাদের সমস্ত ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার হরণ করা হয়।
২০১২ ও ২০১৬-র পর ভয়াবহতা: ২০১৭-র গণহত্যা
২০১২ সালে বৌদ্ধদের সঙ্গে পরিকল্পিত দাঙ্গা বাধিয়ে হাজার হাজার মুসলিম হত্যা ও তাদের ঘরবাড়ি ছাই করে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে সেনাটহল চৌকিতে হামলার জেরে আবার শুরু হয় ধ্বংসযজ্ঞ।
তবে সর্বকালের সর্বকনিষ্ঠ তাণ্ডব নেমে আসে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও উগ্রপন্থী মগদের যৌথ হামলায় সাড়ে তিনশরও বেশি গ্রাম সম্পূর্ণ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। এতে অন্তত ১০ হাজার নিরীহ মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং শত শত নারী পাশবিক ধর্ষণের শিকার হন। জীবন বাঁচাতে সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নদী ও জঙ্গল অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক অধিকার সংস্থাগুলো এই হত্যাকাণ্ডকে "জাতিগত নিধন" (Ethnic Cleansing) এবং "গণহত্যা" (Genocide) হিসেবে আখ্যা দেয়।
কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক শিবিরে বন্দি জীবন
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (UNHCR) ৩০ জুন ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১২ লাখে পৌঁছেছে, যার মধ্যে ৭৭.৬ শতাংশই অসহায় নারী ও শিশু। কক্সবাজারের উপ উপচে পড়া শিবিরে মুক্তভাবে চলাফেরা ও কাজের সুযোগ না থাকায় তারা সম্পূর্ণরূপে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে মানবিক সাহায্য কমে আসায় খাদ্য ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
সমুদ্রপথে মৃত্যুর মিছিল
স্থলপথে অবরুদ্ধ হয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ছে। বিএমএইচসিআরের মুখপাত্র বাবর বালোচ জানিয়েছেন, আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে ভেসে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের নৌকায় চেপে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে গত এক বছরে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা মারা গেছে, যা এই অভিবাসন পথটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী সমুদ্রপথে পরিণত করেছে।
নয় বছর পরও রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিক কোনো রাজনৈতিক সমাধান দৃশ্যমান নয়। মিয়ানমার সামরিক জান্তার অপশাসন ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী এবং আঞ্চলিক স্বার্থান্বেষী রাজনীতির কারণে এই নির্যাতিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সম্মানের সঙ্গে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন এখনও অধরা।
বিষয় : মানবাধিকার রোহিঙ্গা মিয়ানমার রাখাইন

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্মম গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা আরাকান বা রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংখ্যার ৯ বছর পর দাঁড়িয়েছে ১২ লাখে (১.২ মিলিয়ন)। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিক বৈষম্যের শিকার এই গোষ্ঠীটি ১৯৮২ সালের বিতর্কিত আইন এবং পরবর্তী সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় "উদ্বাস্তু" ও "অপনাগরিক" হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। কক্সবাজারের বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে মানবিক সংকটে দিন কাটানো এই জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু, যাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন আজও অনিশ্চিত।
আরাকানের (রাখাইন) নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ভূমিপুত্র এই মুসলিমরা ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালের পর থেকেই মিয়ানমার সামরিক শাসক ও চরমপন্থী গোষ্ঠীর ধারাবাহিক নিগ্রহের শিকার। ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তা ক্ষমতার জবরদখল নেওয়ার পর "ড্রাগন কিং" এবং "ক্লিন অ্যান্ড বিউটিফুল নেশন"-এর মতো সামরিক অভিযানের মাধ্যমে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত করার চক্রান্ত শুরু হয়।
১৯৮২ সালের বৈষম্যমূলক আইন ও ভোটাধিকার হরণ
মিয়ানমারের বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার ১৯৮২ সালে এক আইন প্রণয়ন করে দেশের ১৩৫টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিলেও আরাকানের মুসলিমদের ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেয়। এর ফলে তারা নিজ ভূমিতেই "রাষ্ট্রহীন" (Stateless) নাগরিকের মর্যাদায় পতিত হয়। ২০১৪ সালের প্রথম আনুষ্ঠানিক আদমশুমারি এবং ২০১৫ সালের নির্বাচনেও তাদের সমস্ত ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার হরণ করা হয়।
২০১২ ও ২০১৬-র পর ভয়াবহতা: ২০১৭-র গণহত্যা
২০১২ সালে বৌদ্ধদের সঙ্গে পরিকল্পিত দাঙ্গা বাধিয়ে হাজার হাজার মুসলিম হত্যা ও তাদের ঘরবাড়ি ছাই করে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে সেনাটহল চৌকিতে হামলার জেরে আবার শুরু হয় ধ্বংসযজ্ঞ।
তবে সর্বকালের সর্বকনিষ্ঠ তাণ্ডব নেমে আসে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও উগ্রপন্থী মগদের যৌথ হামলায় সাড়ে তিনশরও বেশি গ্রাম সম্পূর্ণ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। এতে অন্তত ১০ হাজার নিরীহ মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং শত শত নারী পাশবিক ধর্ষণের শিকার হন। জীবন বাঁচাতে সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নদী ও জঙ্গল অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক অধিকার সংস্থাগুলো এই হত্যাকাণ্ডকে "জাতিগত নিধন" (Ethnic Cleansing) এবং "গণহত্যা" (Genocide) হিসেবে আখ্যা দেয়।
কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক শিবিরে বন্দি জীবন
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (UNHCR) ৩০ জুন ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১২ লাখে পৌঁছেছে, যার মধ্যে ৭৭.৬ শতাংশই অসহায় নারী ও শিশু। কক্সবাজারের উপ উপচে পড়া শিবিরে মুক্তভাবে চলাফেরা ও কাজের সুযোগ না থাকায় তারা সম্পূর্ণরূপে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে মানবিক সাহায্য কমে আসায় খাদ্য ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
সমুদ্রপথে মৃত্যুর মিছিল
স্থলপথে অবরুদ্ধ হয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ছে। বিএমএইচসিআরের মুখপাত্র বাবর বালোচ জানিয়েছেন, আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে ভেসে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের নৌকায় চেপে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে গত এক বছরে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা মারা গেছে, যা এই অভিবাসন পথটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী সমুদ্রপথে পরিণত করেছে।
নয় বছর পরও রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিক কোনো রাজনৈতিক সমাধান দৃশ্যমান নয়। মিয়ানমার সামরিক জান্তার অপশাসন ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী এবং আঞ্চলিক স্বার্থান্বেষী রাজনীতির কারণে এই নির্যাতিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সম্মানের সঙ্গে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন এখনও অধরা।

আপনার মতামত লিখুন