ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম, খ্রিস্টান ও দলিত সম্প্রদায়ের ওপর চরম বিদ্বেষ ও হামলা এখন দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই দেশজুড়ে অন্তত ৬৩টি ঘৃণাভিত্তিক সহিংস হামলা ও প্রশাসনিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ২টি হামলার শিকার হয়েছেন সংখ্যালঘুরা। এর মধ্যে বরাবরের মতো সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা গেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি শাসিত উত্তর প্রদেশে।
দক্ষিণের রাজ্য তেলঙ্গানা থেকে শুরু করে উত্তরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল—জুলাই মাসজুড়ে উগ্র চরমপন্থা ও জাতিগত বৈষম্য তীব্র রূপ ধারণ করেছে। তেলঙ্গানায় মুসলিম, খ্রিস্টান ও দলিতদের ওপর অন্তত ৯টি হামলার ঘটনা ঘটে, যা নির্দেশ করে যে উগ্র দক্ষিণপন্থী মতাদর্শ এখন দক্ষিণ ভারতেও সাধারণ জীবনযাত্রায় ছড়িয়ে পড়ছে। ওয়ারঙ্গলে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এক মুসলিম সরকারি কর্মকর্তাকে অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দিতে অস্বীকার করার মতো ঘটনা ঘটেছে।
সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনা ঘটেছে উত্তর প্রদেশে। যেখানে কেবল মৌখিক উসকানি বা মব লিঞ্চিং নয়, বরং রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশকে সরাসরি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রামপুরে বিখ্যাত ‘মুহাম্মদ আলী জওহর ইউনিভার্সিটি’র ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টি ধ্বংসের নোটিশ জারি করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। অন্যদিকে সংভল এলাকায় একটি ঐতিহাসিক ঈদগাহ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক বুলডোজার দিয়ে।
হাপুরে কাওয়ারিয়া উগ্রবাদীদের মারধরে গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন একমাত্র উপার্জনক্ষম মুসলিম চালক। অন্যান্য ঘটনার মধ্যে এক ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বাছুরের সামনে হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। এর বাইরে পুলিশি নির্যাতন, বেআইনি আটক ও আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মম শারীরিক নির্যাতনের অসংখ্য অভিযোগ সামনে এসেছে।
জুলাই মাসে নিট (NEET UG) পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-এর নেতৃত্বে জন্তরমন্তরে ৩৬ দিনের অবস্থান কর্মসূচিতেও চরম ইসলামোফোবিয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আন্দোলনকারীদের বিনামূল্যে খাবার পরিবেশন করে নজর কাড়া মুসলিম স্বেচ্ছাসেবক মো. জুনায়েদকে পুলিশ ও উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে টার্গেট করে। গাজীপুরে তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তার বাবা মোস্তফাকে গ্রেফতার ও ছোট ভাইকে আটক করে পুলিশ। জুনায়েদকে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য মারাত্মক হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া জ্যামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম শিক্ষার্থীদের অহেতুক পুলিশ স্টেশনে নিয়ে হেনস্তা করা হয়। এক উগ্র গো-রক্ষক ভিডিও বার্তা দিয়ে দিল্লি পুলিশের কাছে একদিনের জন্য ক্ষমতা চায়, যাতে আন্দোলনকারীদের “প্রকৃত গুন্ডামি” শেখানো যায়। এমনকি কলকাতায় এক মুসলিম কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে হয়রানি করতে শূকরের মাংস (শুয়োরের মাংস ও বেকন) ক্যাশ অন ডেলিভারি অর্ডারের মাধ্যমে মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়।
সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৫টি প্রধান হামলার নথি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৫ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনায় নির্মাণাধীন এক গির্জায় "জয় শ্রী রাম" স্লোগান দিয়ে হামলা চালায় উগ্র হিন্দুত্ববাদী জনতা। তারা গির্জার ভেতরে ভাঙচুর চালায়, ধর্মীয় প্রতীক ও বাদ্যযন্ত্র বিনষ্ট করে এবং ছাদে থাকা ক্রশ ভেঙে ফেলে। মুর্শিদাবাদে বার্নালি চ্যাটার্জি নামে এক খ্রিস্টান বিধবাকে তার ধর্ম ত্যাগ করে জমি মন্দির তৈরিতে দিয়ে দেওয়ার জন্য জোর জবরদস্তি করা হয়।
অন্যদিকে, দলিতদের ওপরও অন্তত ৯টি মর্মান্তিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। উত্তর প্রদেশে ৪ ও ৫ বছরের শিশুদের দ্বারা ৯ বছরের দলিত শিশুকে গণধর্ষণ, মধ্যপ্রদেশে পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে ১৭ বছরের দলিত কিশোরী ধর্ষণ এবং মিরাটে ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত দলিত প্রতিবাদকারীকে এসএসপি অবিনাশ পান্ডে কর্তৃক প্রকাশ্যে চড় মারার ঘটনা বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় তুলেছে। তামিলনাড়ু ও মধ্যপ্রদেশে জাতপাতের জেরে পিটিয়ে হত্যা ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালানো হয়েছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ৬৩টি নথিভুক্ত ঘটনা কেবল হিমশৈলের চূড়ামাত্র (Tip of the Iceberg)। বাস্তবে ভারতজুড়ে সংখ্যালঘুরা প্রতিদিন এর চেয়েও বহুগুণ বেশি ঘৃণা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখোমুখি হচ্ছেন।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম, খ্রিস্টান ও দলিত সম্প্রদায়ের ওপর চরম বিদ্বেষ ও হামলা এখন দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই দেশজুড়ে অন্তত ৬৩টি ঘৃণাভিত্তিক সহিংস হামলা ও প্রশাসনিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ২টি হামলার শিকার হয়েছেন সংখ্যালঘুরা। এর মধ্যে বরাবরের মতো সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা গেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি শাসিত উত্তর প্রদেশে।
দক্ষিণের রাজ্য তেলঙ্গানা থেকে শুরু করে উত্তরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল—জুলাই মাসজুড়ে উগ্র চরমপন্থা ও জাতিগত বৈষম্য তীব্র রূপ ধারণ করেছে। তেলঙ্গানায় মুসলিম, খ্রিস্টান ও দলিতদের ওপর অন্তত ৯টি হামলার ঘটনা ঘটে, যা নির্দেশ করে যে উগ্র দক্ষিণপন্থী মতাদর্শ এখন দক্ষিণ ভারতেও সাধারণ জীবনযাত্রায় ছড়িয়ে পড়ছে। ওয়ারঙ্গলে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এক মুসলিম সরকারি কর্মকর্তাকে অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দিতে অস্বীকার করার মতো ঘটনা ঘটেছে।
সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনা ঘটেছে উত্তর প্রদেশে। যেখানে কেবল মৌখিক উসকানি বা মব লিঞ্চিং নয়, বরং রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশকে সরাসরি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রামপুরে বিখ্যাত ‘মুহাম্মদ আলী জওহর ইউনিভার্সিটি’র ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টি ধ্বংসের নোটিশ জারি করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। অন্যদিকে সংভল এলাকায় একটি ঐতিহাসিক ঈদগাহ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক বুলডোজার দিয়ে।
হাপুরে কাওয়ারিয়া উগ্রবাদীদের মারধরে গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন একমাত্র উপার্জনক্ষম মুসলিম চালক। অন্যান্য ঘটনার মধ্যে এক ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বাছুরের সামনে হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। এর বাইরে পুলিশি নির্যাতন, বেআইনি আটক ও আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মম শারীরিক নির্যাতনের অসংখ্য অভিযোগ সামনে এসেছে।
জুলাই মাসে নিট (NEET UG) পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-এর নেতৃত্বে জন্তরমন্তরে ৩৬ দিনের অবস্থান কর্মসূচিতেও চরম ইসলামোফোবিয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আন্দোলনকারীদের বিনামূল্যে খাবার পরিবেশন করে নজর কাড়া মুসলিম স্বেচ্ছাসেবক মো. জুনায়েদকে পুলিশ ও উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে টার্গেট করে। গাজীপুরে তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তার বাবা মোস্তফাকে গ্রেফতার ও ছোট ভাইকে আটক করে পুলিশ। জুনায়েদকে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য মারাত্মক হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া জ্যামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম শিক্ষার্থীদের অহেতুক পুলিশ স্টেশনে নিয়ে হেনস্তা করা হয়। এক উগ্র গো-রক্ষক ভিডিও বার্তা দিয়ে দিল্লি পুলিশের কাছে একদিনের জন্য ক্ষমতা চায়, যাতে আন্দোলনকারীদের “প্রকৃত গুন্ডামি” শেখানো যায়। এমনকি কলকাতায় এক মুসলিম কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে হয়রানি করতে শূকরের মাংস (শুয়োরের মাংস ও বেকন) ক্যাশ অন ডেলিভারি অর্ডারের মাধ্যমে মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়।
সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৫টি প্রধান হামলার নথি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৫ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনায় নির্মাণাধীন এক গির্জায় "জয় শ্রী রাম" স্লোগান দিয়ে হামলা চালায় উগ্র হিন্দুত্ববাদী জনতা। তারা গির্জার ভেতরে ভাঙচুর চালায়, ধর্মীয় প্রতীক ও বাদ্যযন্ত্র বিনষ্ট করে এবং ছাদে থাকা ক্রশ ভেঙে ফেলে। মুর্শিদাবাদে বার্নালি চ্যাটার্জি নামে এক খ্রিস্টান বিধবাকে তার ধর্ম ত্যাগ করে জমি মন্দির তৈরিতে দিয়ে দেওয়ার জন্য জোর জবরদস্তি করা হয়।
অন্যদিকে, দলিতদের ওপরও অন্তত ৯টি মর্মান্তিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। উত্তর প্রদেশে ৪ ও ৫ বছরের শিশুদের দ্বারা ৯ বছরের দলিত শিশুকে গণধর্ষণ, মধ্যপ্রদেশে পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে ১৭ বছরের দলিত কিশোরী ধর্ষণ এবং মিরাটে ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত দলিত প্রতিবাদকারীকে এসএসপি অবিনাশ পান্ডে কর্তৃক প্রকাশ্যে চড় মারার ঘটনা বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় তুলেছে। তামিলনাড়ু ও মধ্যপ্রদেশে জাতপাতের জেরে পিটিয়ে হত্যা ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালানো হয়েছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ৬৩টি নথিভুক্ত ঘটনা কেবল হিমশৈলের চূড়ামাত্র (Tip of the Iceberg)। বাস্তবে ভারতজুড়ে সংখ্যালঘুরা প্রতিদিন এর চেয়েও বহুগুণ বেশি ঘৃণা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখোমুখি হচ্ছেন।

আপনার মতামত লিখুন